
বেইজিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠকের পর এই প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়
ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করতে পাঁচ দফা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে চীন ও পাকিস্তান। প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠকের পর এই প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ কূটনীতিকরা ইরান পরিস্থিতি নিয়ে কৌশলগত যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ বন্ধে কোনো প্রধান বৈশ্বিক শক্তির পক্ষ থেকে এটিই প্রথম সুস্পষ্ট পথনকশা বলে মনে করা হচ্ছে।
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইরান ও সৌদি আরবের তেল কেনার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ক্রেতা। পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এর আগে জানায়, চীন ইরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ইরান চীনের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করে, যার বিনিময়ে তেল সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ইরান চীন থেকে সীমিত পরিমাণ আক্রমণাত্মক অস্ত্র ও ড্রোনও কিনেছে বলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যত দ্রুত সম্ভব শান্তি আলোচনা
একজন আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো শান্তি চুক্তির ক্ষেত্রে তেহরান বেইজিংকে গ্যারান্টর বা নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে দেখতে চাইবে।
চীন-পাকিস্তানের পাঁচ দফা প্রস্তাবে মধ্যপ্রাচ্যে ‘তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ’ এবং ‘যত দ্রুত সম্ভব শান্তি আলোচনা শুরু’ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের অঙ্গীকার করতে হবে এবং আলোচনার সময় শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে বিরত থাকতে হবে।
এতে বেসামরিক মানুষ ও সামরিক নয় এমন স্থাপনায় হামলা বন্ধ করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা—যেমন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—লক্ষ্য করে হামলা না চালানোর কথা বলা হয়েছে।
এর আগে ইসরায়েল ইরানের গ্যাসক্ষেত্র, জ্বালানি স্থাপনা এবং বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে চলে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন। সাধারণভাবে প্রতিপক্ষের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রতিশোধ হিসেবে ইরানও ইসরায়েল ও উপসাগরীয় কয়েকটি আরব দেশের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী ও ট্রানজিট ফি বিতর্ক
জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রিক এই সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। তবে সংঘাতের কেন্দ্রে এখন রয়েছে হরমুজ প্রণালী।
সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজস্ব কার্যকর ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু করেছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা লয়েডস লিস্ট জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ইরান জাহাজ থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আদায় করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পার্লামেন্ট হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের একটি পরিকল্পনাও অনুমোদন করেছে।
তবে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ অনুযায়ী কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্র তার আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে অতিক্রমকারী বিদেশি জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি নিতে পারে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুটি দেশই এই সনদের স্বাক্ষরকারী নয়।
চীন ও পাকিস্তান তাদের প্রস্তাবে ইরানের এই উদ্যোগের সঙ্গে একমত নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালী এবং এর পার্শ্ববর্তী জলসীমা পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথ।’ তাই এখানে ‘স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার’ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবের শেষ দফায় জাতিসংঘ সনদের প্রধান্য এবং বহুপাক্ষিকতার ভিত্তিতে একটি ‘সমন্বিত শান্তি কাঠামো’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।