
নওগাঁর নাইটিঙ্গেল তসলিমা ফেরদৌস
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোরী। যার হাতে থাকার কথা ছিল পাঠ্যবই, সেই হাতে উঠল সংসারের চাবি। জীবনের মানে বুঝে ওঠার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল অষ্টম শ্রেণির কিশোরী তসলিমা ফেরদৌসকে। তসলিমা যখন চন্ডীপুর ইউনিয়নের ইলশাবাড়ি গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলেন, দেখলেন এক অন্য পৃথিবী।
সেখানে মেয়েরা সূর্য ডোবার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ে কেননা সন্ধ্যা নামলেই প্রদীপ নেভানো হয় তেল সাশ্রয়ের জন্য। শিক্ষার আলো সেখানে বিলাসিতা। কিন্তু সেই প্রতিকূল অন্ধকারেই নিজের ভেতরে এক অজেয় সূর্যকে লালন করেছিলেন তসলিমা ফেরদৌস। আজ তিনি নওগাঁর সেই নিভৃত গ্রামের এক অনন্য বাতিঘর, যার আলোয় পথ খুঁজে পাচ্ছে শত শত প্রবীণ মা ও অনাথ শিশু।
অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালার লড়াই
বিয়ের পর সংসারের তাগিদেই ধান-চালের কাজের ভিড়েও তসলিমার মন পড়ে থাকত বইয়ের পাতায়। তসলিমা দেখলেন গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারা সারাদিন শুধু ধুলোবালি মেখে খেলাধুলা করে। নিজের পড়ার সুযোগ নেই দেখে তিনি পাড়ার শিশুদের জড়ো করে শেখাতে শুরু করলেন ‘অ আ ক খ’। বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে দেখলেন, তাদের মায়েদেরও অক্ষরজ্ঞান নেই। শুরু হলো এক অসম লড়াই। কিন্তু বাধা এল সেখান থেকেও। রাতে কেরোসিন পুড়িয়ে পড়ানোর অপরাধে সইতে হলো নানাবিধ নির্যাতন, জায়গা হলো হাসপাতালের বিছানায়। পরিবেশ আর পরিস্থিতির চাপে তাকে দমানোর চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু তসলিমার অদম্য ইচ্ছে নদীর স্রোতের মতোই ছিল অপ্রতিরোধ্য।

নওগাঁ শিশু পরিবারের সাথে তসলিমা ফেরদৌস
শূন্য থেকে শুরু
পরবর্তীতে স্বামীর কর্মস্থল পুলিশ কোয়ার্টারে গিয়ে তসলিমা নতুন করে জীবন সাজান। শত রকমের সংকটের মধ্যেও তিনি ডিগ্রি পাস করেন। সেখানেও থেমে থাকেননি; শুরু করলেন সেলাই প্রশিক্ষণ এবং শিশুদের জন্য ছোট এক স্কুল। ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা বগুড়া হয়ে রাজশাহীতেও ডানা মেলে। স্বামীর বদলির কারণে বারবার জায়গা বদলালেও তসলিমার উদ্যোক্তা হওয়ার নেশা কমেনি। রাজশাহীতে গিয়ে তিনি নিজেই কম্পিউটার শিখে ‘কম্পিউটার কর্নার’ নামে এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেন। নিজে লিফলেট বিলি করে ছাত্রছাত্রীদের ডেকে আনতেন স্বল্প মূল্যে শেখানোর জন্য।
রাজধানীর সংগ্রাম ও ‘বেলাশেষে’র জন্ম
ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে একসময় তসলিমা ঢাকায় চলে আসেন। অচেনা এই ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকা ছিল কঠিন। তবুও হার মানেননি তিনি। নিজের মেধা আর পরিশ্রমের জোরে সমবায় ব্যাংকে অফিসার পদে চাকরি করেন। সেখানে দ্রুত পদোন্নতি পেলেও তসলিমার মন পড়ে থাকত সেইসব মানুষের জন্য, যাদের কেউ নেই। তিনি চাইতেন এমন এক আশ্রয়, যেখানে মানুষের শেষ বয়সটা হবে মর্যাদার। সেই ভাবনা থেকেই ২০০৫ সালে নিজের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেলাশেষে’ প্রবীণ নিবাস। শুরুতে এটি সামাজিকভাবে অসহায় কিন্তু আর্থিকভাবে সচ্ছলদের জন্য হলেও, তসলিমা দ্রুতই সেখানে এমন সব প্রবীণ মায়েদের আশ্রয় দিতে শুরু করেন যাদের হাত একদম খালি। চাকরির বেতনের বড় একটা অংশ এবং জমানো টাকা দিয়ে তিনি ২০ জন মায়ের অন্ন, বস্ত্র ও সেবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। এভাবেই রাজধানীর ইট-পাথরের দেয়ালের মাঝেই জন্ম নেয় মানবতার এক নতুন অধ্যায় ‘বেলাশেষে’।

বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিবেদিত প্রাণ তসলিমা
নাড়ির টানে ফিরে আসা
২০১১ সালে তসলিমা ফিরে আসেন নওগাঁর ইলশাবাড়িতে। যে গ্রামে একসময় তাকে বাতি জ্বালাতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, সেই গ্রামেই স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মাহবুব আলাম এর এক খণ্ড জমিতে গড়ে তোলেন স্থায়ী ‘বেলাশেষে’। এটি এমন এক আশ্রম যেখানে সন্তানহারা বা সন্তান ত্যাজ্য মায়েদের জন্য অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। নানাজাতের গাছপালা রঙ্গিন ফুল ও পাখির অবাধ বিচরণে ঘেরা এই আশ্রমে আজ ১৫ জন মা ও শিশু খুঁজে পেয়েছে তাদের হারানো পরিবার।
খাবারের প্লেটে মানবতার স্বাদ
তসলিমা জানতেন, পরমুখাপেক্ষী হয়ে মহৎ কাজ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই নিজের স্বপ্নের প্রবীণ নিবাস চালাতে তিনি গড়ে তুলেছেন নওগাঁ শহরের প্রথম মিউজিক্যাল ক্যাফে। ক্যাফের ঝনঝনানি আর শতাধিক খাবারের সুবাসে যে আয় হয়, তার পুরোটাই ব্যয় হয় ‘বেলাশেষে’র ১৫ জন মা ও শিশুর অন্ন, বস্ত্র আর চিকিৎসায়। শুধু তাই নয়, বেলাশেষের প্রাঙ্গণে ঘরোয়া পরিবেশে চালু করেছেন সান্ধ্যকালিন টঙঘর রেস্তোরা। তার সাথে কাজ করছেন অর্ধশত শিক্ষার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত নারী, যারা তসলিমার হাত ধরে খুঁজে পেয়েছেন স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।
মায়ের শেষ ঠিকানার অতন্দ্র প্রহরী
তসলিমা কেবল আশ্রয় দেন না, তিনি প্যারালাইজড মায়েদের রাত জেগে সেবা করেন, নিজ হাতে খাইয়ে দেন। এমনকি যেসব মায়ের মৃত্যুর পর সন্তানরা লাশ নিতে আসে না, তাদের দাফন-কাফনের কাজও তিনি নিজেই সুসম্পন্ন করেন। পারিবারিক গোরস্থানে তিনি আগাম ব্যবস্থা করে রেখেছেন, যেন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করার সময় অন্তত সম্মানটুকু পান এই মায়েরা। তসলিমা ফেরদৌস প্রমাণ করেছেন, জীবনের ‘বেলাশেষে’ এসেও কারো জীবনের শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ হওয়া সম্ভব।
প্রাপ্তি ও আগামীর স্বপ্ন
তসলিমা ফেরদৌসের এই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথের প্রতিটি বাঁকে জুটেছে মানুষের ভালোবাসা আর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভূষিত হয়েছেন অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায়। ২০২৪ সালে তাঁর ঝুলিতে যুক্ত হয় বিশেষ অর্জন— ‘এমএসএমই অনার ২০২৪’। সেখানে তাঁকে ‘চ্যাম্পিয়ন অফ কজ’ ক্যাটাগরিতে মানবিক উদ্যোক্তা হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।

নিঃস্বার্থ মানবিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তসলিমা পেয়েছেন অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা
এছাড়াও তাঁর অর্জনের তালিকায় রয়েছে— ‘রাঁধুনী কীর্তিমতী হিতৈষী সম্মাননা’, নারী জাগরণের অগ্রদূত ‘বেগম রোকেয়া সম্মাননা’, এবং ‘কাবিল খান মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড’। সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদ থেকে ‘গুণীজন অ্যাওয়ার্ড’। এর আগে ২০২৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘মাদার তেরেসা শাইনিং পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হন।
তসলিমার কাছে এই সম্মাননাগুলো কেবল দেয়ালে ঝোলানো সনদ নয় বরং এগুলো তাঁর আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার রসদ। তিনি বলেন, “এক একটি সম্মাননা আমার এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি এবং সেই স্বপ্ন নিয়েই বাঁচতে চাই।”
তাঁর আগামীর লক্ষ্য ‘বেলাশেষে সমাজ কল্যাণ সংস্থা’র পরিসর আরও বাড়ানো, যেখানে কেবল আশ্রয় নয় বরং অসহায় মা ও বোনদের জন্য কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা থাকবে। তসলিমা বিশ্বাস করেন, অবহেলিত এই নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারলেই সমাজের একটি বড় অংশ অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখবে।

তসলিমার ছায়াতলে গড়ে উঠছে সামাজিক সংগঠন
তসলিমা ফেরদৌস প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছেশক্তি থাকলে তেলের বাতি নিভে গেলেও মনের আলোয় পুরো সমাজকে আলোকিত করা যায়। তিনি আজ নওগাঁর সেই ‘নাইটিংগেল’, যিনি শিখিয়েছেন—জীবন সায়াহ্নে এসেও এক মুঠো রোদ্দুর হওয়া সম্ভব।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প