
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং
মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং দেশটির সেনাসমর্থিত পার্লামেন্টের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে ২০২১ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার প্রায় পাঁচ বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে আরও দৃঢ় হলো।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট ভোটে ৫৮৪টি ভোটের মধ্যে অন্তত ২৯৩টি ভোট পান ৬৯ বছর বয়সী এই জেনারেল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর ভোটগণনার হিসাবে এ তথ্য জানা গেছে। খবর আল জাজিরার।
২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন মিন অং হ্লাইং। অভ্যুত্থানের পর সু চিকে আটক করা হয়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয় এবং পরে তা সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়।
শীর্ষ সেনাপ্রধান থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্টে তার এই রূপান্তর ঘটে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর। সেই নির্বাচনে সেনাসমর্থিত একটি দল বিপুল ব্যবধানে জয় লাভ করে। তবে সমালোচক ও পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনটিকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা প্রহসনমূলক নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছে।
নির্বাচনে সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) পার্লামেন্টের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ৮০ শতাংশের বেশি জয় করে। পাশাপাশি সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা মোট আসনের এক-চতুর্থাংশ দখল করে রাখেন, যেগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না।
শুক্রবার পার্লামেন্টে সরাসরি সম্প্রচারিত ভোটগণনায় দেখা যায়, পূর্বাভাস অনুযায়ী মিন অং হ্লাইং সহজেই প্রয়োজনীয় ভোটসংখ্যা অর্জন করেন। এ সপ্তাহের শুরুতে প্রেসিডেন্ট পদে তিনজন প্রার্থী মনোনীত হয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই প্রেসিডেন্ট হওয়ার লক্ষ্য ছিল মিন অং হ্লাইংয়ের। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদলও করেন।
সোমবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার সময় তিনি সাবেক গোয়েন্দা প্রধান এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত য়ে উইন উ-কে সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক নেতৃত্বে এই পরিবর্তন এবং মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট পদে আরোহন একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তিনি বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করতে চান এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছেন, একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দেশ পরিচালনা করা সেনাবাহিনীর স্বার্থও রক্ষা করতে চান।
তবে গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ এখনও অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি সামরিকবিরোধী কয়েকটি গোষ্ঠী—যার মধ্যে সু চির দলের অবশিষ্ট অংশ ও বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে—একটি নতুন যৌথ জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
এই জোটের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর দ্য ইমার্জেন্স অব এ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো সব ধরনের স্বৈরতন্ত্র, বিশেষ করে সামরিক একনায়কতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা এবং একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ওপর সামরিক চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোও নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।