
বিশ্বজুড়ে মরণব্যাধি ক্যান্সারের তালিকায় অন্যতম আতঙ্কের নাম কোলোরেক্টাল ক্যান্সার
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মরণব্যাধি ক্যান্সারের তালিকায় অন্যতম আতঙ্কের নাম কোলোরেক্টাল ক্যান্সার। এটি মূলত আমাদের অন্ত্র বা কোলন এবং মলদ্বারের ক্যান্সার। নীরবে শরীরে দানা বাঁধা এই রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণই প্রকাশ করে না, যা একে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। তবে সঠিক সময়ে সচেতনতা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে এই ঘাতক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানবো কোলোরেক্টাল ক্যান্সার কী, এর লক্ষণ এবং প্রতিকারের উপায়;
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার কী?
কোলন এবং মলদ্বারের আস্তরণের কোষগুলো যখন অস্বাভাবিক এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে, তখনই কোলোরেক্টাল ক্যান্সার দেখা দেয়। এই অস্বাভাবিক কোষগুলো ধীরে ধীরে টিউমার তৈরি করে, যা পরে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একে ‘মেটাস্ট্যাটিক টিউমার’ও বলা হয়।
লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ না থাকলেও, রোগটি কিছুটা ছড়িয়ে পড়লে শরীরে নিচের পরিবর্তনগুলো দেখা দিতে পারে:
দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া
মলদ্বারে রক্তপাত হওয়া বা কালচে রঙের মল
পেটে অস্বস্তি, খিঁচুনি বা সবসময় ফোলাভাব অনুভব করা
অত্যধিক ক্লান্তি, ক্ষুধা হ্রাস এবং ওজন কমে যাওয়া
তলপেট বা পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা
বয়স ও লিঙ্গ: সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ঝুঁকির হার বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের তুলনায় পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি।
পলিপ: কোলনের ভেতরের দেয়ালে থাকা ‘অ্যাডেনোমা’ নামক এক ধরনের পলিপ ভবিষ্যতে ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে কারোর এই ক্যান্সার থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদেরও সতর্ক থাকা জরুরি।
রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখন এই রোগ দ্রুত ধরা সম্ভব। কোলনোস্কোপি বা সিগময়েডোস্কোপির মাধ্যমে সন্দেহজনক অংশের নমুনা (বায়োপসি) নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ক্যান্সার শরীরের কতটুকু ছড়িয়েছে তা জানতে সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পিইটি স্ক্যান করা হয়। চিকিৎসায় মূলত সার্জারি, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপি ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়।

প্রায় ২৫ শতাংশ কোলোরেক্টাল ক্যান্সার কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রতিরোধ করা সম্ভব
লাইফস্টাইল কেমন হওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ২৫ শতাংশ কোলোরেক্টাল ক্যান্সার কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আপনার প্রতিদিনের রুটিন এমন হওয়া উচিত:
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল এবং লাল চাল বা আটার মতো আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। এটি অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
রেড মিট (গরু বা খাসির মাংস) এবং প্রসেস করা মাংস (সসেজ, নাগেটস) খাওয়া কমিয়ে দিন।
অলস জীবনযাপন ত্যাগ করে দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই জরুরি।
ধূমপান এবং অ্যালকোহল সেবন পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে, কারণ এগুলো কোলনের কোষের ক্ষতি করে।
কোলোরেক্টাল ক্যান্সার মানেই অবধারিত মৃত্যু নয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে এই ঘাতককে রুখে দিতে। আপনার সামান্য সচেতনতাই পারে আপনার ও আপনার পরিবারের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে। শরীরে সামান্যতম অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।