
সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ইরান আপাতত নিজের নিরাপত্তার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে পাকিস্তান দুই ধাপের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, উভয় পক্ষ এখন এই কাঠামোটি বিবেচনা করছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সোমবার বলেন, পাকিস্তান কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে এবং তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পরিকল্পনা দিয়েছে, যার লক্ষ্য শত্রুতার অবসান ঘটানো। তবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যে ইরান আপাতত নিজের নিরাপত্তার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সোমবার তেহরানের একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং আসালুয়েহতে অবস্থিত সাউথ পার্স পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টে বোমা হামলায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান।
এর আগে রবিবার অ্যাক্সিওস জানায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা একটি সম্ভাব্য ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছে। এটি একটি ‘দুই ধাপের চুক্তি’র অংশ হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে।
রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
সূত্রটি জানায়, ‘আজই সব বিষয় চূড়ান্তভাবে সম্মত হতে হবে।’ প্রাথমিক সমঝোতাটি পাকিস্তানের মাধ্যমে ইলেকট্রনিকভাবে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আকারে সম্পন্ন হতে পারে, যেখানে পাকিস্তানই আলোচনার একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং হরমুজ প্রণালী আবার চালু করা হবে। এরপর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত করা হবে।
প্রস্তাবিত এই চুক্তিকে আপাতত ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ নামে ডাকা হচ্ছে। এতে হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরির কথাও রয়েছে। চূড়ান্ত সরাসরি আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
‘হরমুজ প্রণালী খুলবে না’
তবে তেহরান জানিয়েছে, অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে না। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে ইরান কোনো সময়সীমা মেনে নেবে না। একই সঙ্গে তিনি বলেন, স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য ওয়াশিংটনও এখনো প্রস্তুত নয়।
আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভাইদ বলেন, পাকিস্তান এখন ‘হতাশাজনক ও দ্রুতগতির কূটনীতি’ চালাচ্ছে।
তার ভাষায়, ‘একজন কর্মকর্তা এটিকে স্কুলছাত্রদের মারামারির সঙ্গে তুলনা করেছেন। এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে দুই পক্ষের অহংকার সামলানো এবং গভীর অবিশ্বাসের সমুদ্রের ওপর সেতু গড়ে তোলা।’
তিনি জানান, পাকিস্তান ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্ব, কূটনীতিক এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কিন্তু পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো অনেক বেশি।
জাভাইদ বলেন, ‘ইরান বলছে তারা বহুবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে। তাই যদি কোনো সমঝোতা হয়ও, তাদের নেতাদের ভবিষ্যতে লক্ষ্যবস্তু করা হবে না—এর নিশ্চয়তা কী?’
যুক্তরাষ্ট্রের ‘১৫ দফা পরিকল্পনা’কে অযৌক্তিক বলছে তেহরান
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘায়ি সোমবার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে যে ১৫ দফা পরিকল্পনা দিয়েছিল, তা তেহরান কখনোই গ্রহণ করবে না।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলো নিয়ে ইরান নিজেদের দাবি চূড়ান্ত করেছে, তবে উপযুক্ত সময়েই তা প্রকাশ করা হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তানসহ কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনাও আমাদের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু এসব প্রস্তাব অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, অস্বাভাবিক এবং অযৌক্তিক।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরানের নিজস্ব একটি কাঠামো রয়েছে। আমাদের স্বার্থ ও বিবেচনার ভিত্তিতে আমরা আমাদের দাবির একটি তালিকা তৈরি করেছি।’
হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্বেগ
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এমন সময় এসেছে যখন যুদ্ধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশেরও বেশি এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। বর্তমানে এটি কার্যত ইরানের অবরোধের মধ্যে রয়েছে।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত নগ্ন ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মঙ্গলবারের মধ্যে যদি তেহরান কোনো চুক্তিতে না আসে এবং প্রণালী না খোলে, তবে তিনি দেশটিতে ‘নরক নামিয়ে আনবেন।’
ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননেও অভিযান চালিয়েছে এবং বৈরুতে হামলা করেছে। লেবাননের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে অন্তত ১,৪৬১ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১২৪ জন শিশু। এছাড়া ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।