
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও চীনের এই উদ্যোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার নতুন কৌশল নিচ্ছে ইরান ও চীন—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইরান ও চীন দীর্ঘদিনের একটি অভিন্ন অভিযোগ—ডলারের আধিপত্য—নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্ববাজারে তেল লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশই ডলারে হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে—যা ইরান ও চীনের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগ।
এ প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি, যা দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহিত হয়, সেখানে ইরানের নিয়ন্ত্রণকে নতুনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি নিচ্ছে।
মার্চ মাস পর্যন্ত অন্তত কয়েকটি জাহাজ ইউয়ানে অর্থ পরিশোধ করেছে বলে জানা গেছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকেও বৈশ্বিক তেলবাজারে ‘পেট্রোইউয়ান’ চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে চাইছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির আওতায় দুই দেশের বাণিজ্য ইতোমধ্যে অনেক বেড়েছে।
চীন বর্তমানে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, যা মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি। বিনিময়ে ইরান চীন থেকে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও শিল্প উপকরণ আমদানি করে। যুদ্ধের মধ্যেও এই তেল বাণিজ্যে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেনি।
চীনের লক্ষ্য দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে এটিকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তবে এখনো ডলারের তুলনায় ইউয়ানের অবস্থান অনেক দুর্বল। আন্তর্জাতিক রিজার্ভে ডলারের অংশ প্রায় ৫৭ শতাংশ, যেখানে ইউয়ানের অংশ মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউয়ানের ব্যবহার বাড়লেও তা দ্রুত ডলারের বিকল্প হয়ে উঠবে না। তবে এটি ধীরে ধীরে ডলারের আধিপত্যে চাপ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে।
তাদের মতে, এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে ঘটতে পারে। ভবিষ্যতে যুদ্ধের ফলাফল এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে, ডলারের আধিপত্য কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও চীনের এই উদ্যোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ডলারের বিকল্প হিসেবে ইউয়ানকে সামনে আনার চেষ্টা আরও জোরালো হচ্ছে।