
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাব এ বছর বাংলাদেশে দারিদ্র্য আরও বাড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট–এর এপ্রিল সংস্করণে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় চাপের মুখে আছে। বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। পরবর্তী অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে ৩.৯ শতাংশ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দারিদ্র্যের দ্রুত বৃদ্ধি। ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সময়ে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকলে এই সংখ্যা আরও ১২ লাখ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশ ছিল, যা এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে প্রায় ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, যা সরাসরি দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের সংকটও অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে সতর্ক, ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হচ্ছে।
প্রতিবেদন বলছে, ব্যবসা পরিবেশের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও উচ্চ ঋণব্যয় বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি করেছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কমে গিয়ে তরুণ শ্রমবাজারে চাপ বাড়ছে।
রাজস্ব খাতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। কম কর আদায় ও বাড়তি ব্যয়ের কারণে সরকারের বাজেট বাস্তবায়ন চাপের মুখে পড়ে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের ব্যয় বাড়ায় আর্থিক পরিসর আরও সংকুচিত হচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াতে পারে; রপ্তানি ও প্রবাস আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সংকট মোকাবিলায় কর সংস্কার, কঠোর মুদ্রানীতি, ব্যাংক খাতের দ্রুত সংস্কার এবং ব্যবসা পরিবেশ সহজীকরণ জরুরি বলে সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। তাদের মতে, সময়োপযোগী নীতি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে ফিরতে পারে; অন্যথায় প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হয়ে দারিদ্র্যের চাপ বাড়বে।