
ফলে আসন্ন আলোচনায় স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে
দুইদিন আগে, গেলো মঙ্গলবার রাতের দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে আসে। কারণ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর ফলে পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা সহিংস হামলা ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য সাময়িকভাবে থেমে যায়।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘একটি পুরো সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ হুমকি দেন এবং জবাবে তেহরান উপসাগরসহ অন্যান্য অঞ্চলে আরও হামলার সতর্কতা দেয়।
তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার ৯০ মিনিট আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দিলে যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য হামলা বন্ধ রাখবে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান এই প্রণালীতে চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল।

ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা আলোচনার জন্য ‘কার্যকর ভিত্তি’ হতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতে, এই প্রস্তাবের একটি শর্ত হলো—হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, এই দুই সপ্তাহে প্রণালী দিয়ে চলাচল ‘ইরানি সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে’ সম্ভব হবে।
আগামীকাল শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধানের জন্য এমন কোনো চুক্তিতে রাজি হতে পারে, যাতে ইরানকে হরমুজ প্রণালীর ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে।
সৌদি আরবভিত্তিক বিশ্লেষক হেশাম আলঘান্নাম বলেন, ‘একটি নীরব কিন্তু স্পষ্ট উদ্বেগ রয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য ইরানকে কিছু প্রভাব দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন।’
গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)-এর ছয়টি দেশ—যারা প্রায় প্রতিদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে—যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও জোর দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালী অবশ্যই পুরোপুরি খুলতে হবে এবং যে কোনো চুক্তি হতে হবে স্থায়ী।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে যদি দুর্বল হলেও ইরান প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।
এদিকে ট্রাম্প বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যৌথ উদ্যোগ গঠন করা যেতে পারে। যদিও হোয়াইট হাউস পরে জানায়, প্রণালীটি কোনো শর্ত ছাড়াই খুলে দেওয়াই এখন তাদের অগ্রাধিকার।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা পরিস্থিতির নাজুক দিক স্পষ্ট করেছে।
সংঘাতের শুরু থেকে জিসিসি দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, বরং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল। তবে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে কঠোর ভাষায় সতর্কতা দিয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাহরাইন-সমর্থিত একটি প্রস্তাবে প্রণালী খোলা রাখতে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান অনুমোদনের আহ্বান জানানো হলেও রাশিয়া ও চীন সেটি ভেটো দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দেশগুলোর বহু বছরের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
যদিও কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামাদ আলথুনাইয়ানের মতে, ‘ইরান আগ্রাসী পথ অব্যাহত রাখলে উপসাগরীয় দেশগুলো বসে থাকবে না।’
তবে আলোচনায় বড় বাধা হয়ে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান পুরোপুরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক, কিন্তু ইরান তা মানতে রাজি নয়।
ফলে আসন্ন আলোচনায় স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।