
অবরোধ কার্যকর রাখতে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন, যা মার্কিন সেনাদের সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলছে
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি শুধু অর্থনীতিতেই নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এই অর্থনৈতিক ‘চিকেন গেম’-এ এখন পর্যন্ত কিছুটা এগিয়ে রয়েছে ইরান। তবে সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে, তারা এখনো পিছু হটছে না।
এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের অর্থনীতির ওপরই গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। প্রায় ৩১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, এই চাপ তারা ইরানের তুলনায় বেশি সহ্য করতে পারবে।

তবে অবরোধ কার্যকর রাখতে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি প্রয়োজন, যা মার্কিন সেনাদের সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বেশিরভাগ হামলা আকাশপথে চালিয়ে স্থলবাহিনীকে ঝুঁকি থেকে দূরে রেখেছিল। কিন্তু সমুদ্রপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত আগেই শক্তিশালী। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সেনা হতাহতের আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলছে। ট্রাম্প আশা করছেন, ইরান আগে পিছু হটবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ইরান দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে সক্ষম।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষক হেলিমা ক্রফট বলেন, তেলের এই ‘চিকেন গেম’ আরও তীব্র হচ্ছে। মনে হয় না, কোনো পক্ষই সহজে পিছু হটবে।
তেলের বাজারে চাপ
অবরোধের কারণে ইরানের প্রতিদিন রপ্তানিকৃত প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বৈশ্বিক বাজার থেকে হারিয়ে যেতে পারে, যা বিশ্ব চাহিদার প্রায় ২ শতাংশ। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণের ফলে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম, যা ইতোমধ্যে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, আরও বাড়তে পারে।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় পর্যন্ত জ্বালানির উচ্চমূল্য থাকতে পারে।
ইরানের ওপর চাপ ও সক্ষমতা
অবরোধ ইরানের প্রধান আয়ের উৎস—তেল রপ্তানিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বিকল্প রপ্তানি সক্ষমতা সীমিত।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে। বিভিন্ন উপায়ে তেল রপ্তানি চালিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাদের রয়েছে, যেমন অন্য দেশের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি বা বিকল্প রুট ব্যবহার করা।
বিশ্লেষকদের মতে, সময় ইরানের পক্ষেই কাজ করছে।
সংঘাতের নতুন ঝুঁকি
এই অবরোধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে, যা বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, অবরোধের কাছে এলে ইরানের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হবে। জবাবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা বলেছেন, তাদের বন্দর অবরোধের চেষ্টা করলে মার্কিন নৌযানকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠানো হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইতোমধ্যে কাতার ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী ও ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীও সংঘাতে আরও সক্রিয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এই অবরোধ আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।