
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির
প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে দ্বিতীয় দফা বৈঠক আয়োজন নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ৮ এপ্রিল ঘোষিত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসার মধ্যেই এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালযয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আলোচনায় কারা অংশ নেবেন, প্রতিনিধিদলের আকার কেমন হবে—এসব সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ওপর নির্ভর করছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের জন্য আলোচনার গোপনীয়তা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এতে না কোনো অগ্রগতি হয়েছে, না ভেঙে গেছে।’ তিনি নিশ্চিত করেন, পারমাণবিক ইস্যু এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা জানান তিনি।

সমান্তরাল কূটনৈতিক তৎপরতা
পাকিস্তান সরকার আলোচনাকে এগিয়ে নিতে একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ চালাচ্ছে, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ইসলামাবাদ প্রক্রিয়া’ বলছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিনের আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে জেদ্দার পর দোহায় পৌঁছেছেন এবং সেখান থেকে তার আনতালিয়ায় যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানে গিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ইসলামাবাদে আলোচনা আয়োজনের জন্য তারা কৃতজ্ঞ। এছাড়া ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ইসলামাবাদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনা শুধুমাত্র পাকিস্তানেই হবে, কারণ তারা পাকিস্তানের ওপর আস্থা রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান দ্বিমুখী কৌশল নিয়েছে—একদিকে প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সমর্থন জোগাড় করছেন, অন্যদিকে সামরিক নেতৃত্ব সরাসরি আলোচনায় ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্যোগ
তুরস্কের আনতালিয়ায় ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় কূটনৈতিক ফোরামের পাশে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সম্ভবত মিশরের মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম গঠনের আলোচনা চলছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, এই ধরনের একটি জোট দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা
৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। এখনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তি না হলেও যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ উভয় পক্ষই নতুন করে সংঘাতে যেতে আগ্রহী নয়।
বড় বাধাগুলো রয়ে গেছে
দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পথে কয়েকটি বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ইরান চাইছে, লেবাননের পরিস্থিতিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হোক, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা আলাদা রাখতে চায়। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি বিষয়ই আলোচনার প্রধান জটিলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এটি খোলা রাখা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, অনিশ্চয়তা থাকলেও উভয় পক্ষের কাছ থেকে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথই একমাত্র কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।