
২২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’
পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আজ ২২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’ বা ‘আর্থ ডে’। ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দিনটি এখন বিশ্বের প্রায় ১৯৩টি দেশে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষকে একত্রিত করে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের শক্তি, আমাদের গ্রহ’।
ইতিহাস
ধরিত্রী দিবসের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫৬ বছর আগে। ১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পায়নের ফলে পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছিল। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা বারবারায় বিশাল তেল নিঃসরণের ফলে হাজার হাজার সামুদ্রিক প্রাণী মারা যায় এবং সমুদ্রের পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে। এই ঘটনাটি তৎকালীন মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসনকে গভীরভাবে বিচলিত করে।
তিনি উপলব্ধি করেন যে, ছাত্র আন্দোলনের মতো পরিবেশ রক্ষার জন্যও বড় একটি জনজাগরণ প্রয়োজন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় নেমে আসে প্রায় ২ কোটি মানুষ। সেই ঐতিহাসিক পদযাত্রায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ অংশ নিয়ে দূষণমুক্ত পৃথিবীর দাবি জানায়। মূলত সেই আন্দোলন থেকেই জন্ম হয় ‘আর্থ ডে’ বা ‘ধরিত্রী দিবস’। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ডেনিস হেইসের নেতৃত্বে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক রূপ পায় এবং পৃথিবীজুড়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়।

সেই প্রথম আয়োজনের গতিবেগ যুক্তরাষ্ট্রে একটি মাইলফলক হিসেবে পরিবেশগত আইন প্রণয়নে সাহায্য করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে– মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইউনাইটেড স্টেটস এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি) গঠন এবং ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট ও ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্টের মতো আইন।
১৯৯০ সালের মধ্যে ধরিত্রী দিবস যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৈশ্বিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যা ১৪০টিরও বেশি দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষকে সক্রিয় করে তোলে। বর্তমানে এটি আর্থডে.ওআরজি (EARTHDAY.ORG) দ্বারা পরিচালিত হয় এবং ১৯০টিরও বেশি দেশে পালিত হয়, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম নাগরিক অনুষ্ঠানে পরিণত করেছে।
দিবসের তাৎপর্য ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধরিত্রী দিবসের তাৎপর্য অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং আমরা এক ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজাড় থেকে শুরু করে দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পর্যন্ত– পৃথিবী আজ নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে।
১. জলবায়ু পরিবর্তন: অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণের ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, যা সমুদ্রের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। ধরিত্রী দিবসের মূল তাৎপর্য হলো এই কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে বিশ্বকে ধাবিত করা।
২. প্লাস্টিক দূষণ: এবারের দিবসের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ‘প্লাস্টিক বনাম ধরিত্রী’। মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আমাদের খাদ্যচক্রেও ঢুকে পড়েছে। সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করছে এই অপচনশীল বর্জ্য। ধরিত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্লাস্টিক মুক্ত পৃথিবী গড়তে না পারলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
৩. জীববৈচিত্র্য রক্ষা: বনভূমি উজাড় হওয়ার ফলে বহু প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। ধরিত্রী দিবস আমাদের প্রকৃতিকে ভালোবাসতে এবং অধিক হারে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পৃথিবীর ফুসফুসকে সতেজ রাখার বার্তা দেয়।
তবুও এই দিনটি আশার আলো বহন করে। এটি সম্মিলিত পদক্ষেপের একটি মুহূর্ত হিসেবে কাজ করে এবং ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সরকারকে একত্রিত হয়ে প্রাকৃতিক বিশ্বকে রক্ষার অঙ্গীকার করার সুযোগ করে দেয়।
ধরিত্রী দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়স্থল এই নীল গ্রহের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার অঙ্গীকার। আমাদের ছোট্ট একটি সচেতন পদক্ষেপ— যেমন একটি গাছ লাগানো বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জন করা— ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সাহায্য করবে।
ভিজুয়াল স্টোরি