
বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন সম্রাট সত্যজিৎ রায়
সিনেমার রূপালি পর্দায় কাশফুলের মাঝ দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে চলা সেই রেলগাড়ি কিংবা অপু-দুর্গার বৃষ্টির দিনে ভিজে একাকার হওয়ার দৃশ্য— এসবই আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের অমলিন মহাকাব্য। আজ ২৩ এপ্রিল। ঠিক ৩৪ বছর আগে ১৯৯২ সালের এই বিষণ্ণ দিনে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মুকুটহীন সম্রাট সত্যজিৎ রায়। তিনি শুধু একজন পরিচালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সংগীত পরিচালক, গীতিকার এবং দক্ষ চিত্রশিল্পী। বাঙালির শিল্পচেতনার আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি আজও আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিন।
কিশোরগঞ্জ থেকে শান্তিনিকেতন
১৯২১ সালের ২ মে কলকাতার বিখ্যাত ‘রায় পরিবারে’ জন্ম নেন এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তি। যার পৈতৃক ভিটা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসুয়া গ্রামে। ঠাকুরদাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী আর বাবা সুকুমার রায়ের উত্তরসূরি হিসেবে শৈশব থেকেই শিল্পের আবহে বেড়ে উঠেছেন তিনি। প্রেসিডেন্সিতে অর্থনীতির পাঠ চুকিয়ে মায়ের ইচ্ছায় শান্তিনিকেতনের কলাভবনে চারুকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানেই তার চোখে ধরা পড়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দৃশ্যভাষার এক সূক্ষ্ম ও গভীর বোধ।

সত্যজিৎ শিখিয়ে গেছেন ক্যামেরা কেবল ছবি তোলে না, ক্যামেরা জীবনকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে
বিজ্ঞাপনকর্মী থেকে পরিচালক
১৯৪৩ সালে বিজ্ঞাপন সংস্থার ‘ভিজ্যুয়ালাইজার’ হিসেবে কাজ শুরু করলেও তার ভাগ্যে লেখা ছিল ভিন্ন কিছু। লন্ডনে থাকাকালীন তিন মাসে ৯৯টি সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। বিশেষ করে ভিত্তোরিও দে সিকার ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ দেখে তিনি স্থির করেন—চলচ্চিত্রই হবে তার প্রতিবাদের ভাষা। আর সেই সংকল্প থেকেই জন্ম নেয় ‘পথের পাঁচালী’। বিভূতিভূষণের উপন্যাস যখন তার হাতে সেলুলয়েডে বন্দি হলো, বদলে গেল উপমহাদেশের সিনেমার ব্যাকরণ। আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন, ‘সত্যজিতের সিনেমা না দেখা মানে পৃথিবীতে থেকেও সূর্য বা চাঁদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।’

অপু ট্রিলজি থেকে কালজয়ী সব অমর সৃষ্টি
অপুর শৈশব থেকে শুরু করে ‘অপরাজিত’ আর ‘অপুর সংসার’—এই তিন কিস্তিতে তিনি মানবজীবনের যে নিস্তরঙ্গ বাস্তবতা দেখিয়েছেন, তা বিশ্ববাসীর কাছে হয়ে আছে বিস্ময়। এরপর একে একে উপহার দিয়েছেন ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘চারুলতা’ এবং ‘নায়ক’-এর মতো ছবি। কখনও তিনি সামন্ততন্ত্রের কুসংস্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন, কখনও শহুরে মধ্যবিত্তের যান্ত্রিক জীবনের জটিলতা ফুটিয়ে তুলেছেন ‘মহানগর’ কিংবা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে। আবার ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ আর ‘হীরক রাজার দেশে’র মাধ্যমে রূপকথার আড়ালে করেছেন রাষ্ট্র ও সমাজের তীব্র সমালোচনা।

সত্যজিৎ মানেই রহস্যের রোমাঞ্চে ভরা ‘ফেলুদা’ আর বৈজ্ঞানিক কল্পনার ডানা মেলা ‘প্রফেসর শঙ্কু’
ফেলুদা থেকে অস্কার
সত্যজিৎ মানেই শুধু ক্যামেরা নয়, সত্যজিৎ মানেই রহস্যের রোমাঞ্চে ভরা ‘ফেলুদা’ আর বৈজ্ঞানিক কল্পনার ডানা মেলা ‘প্রফেসর শঙ্কু’। তিনি তার বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতেন নিজে, আবহ সংগীতের সুর তুলতেন আপন মননে। তার ঝুলি ভরা ছিল আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। অক্সফোর্ডের সম্মানসূচক ডক্টরেট থেকে শুরু করে ফরাসি সরকারের ‘লেজিওঁ দনরে’—সবই ধরা দিয়েছে তার মুঠোয়। আর মৃত্যুর কিছুদিন আগে শয্যাশায়ী অবস্থায় যখন তিনি ‘অস্কার’ (একাডেমি অ্যাওয়ার্ড) ও ‘ভারতরত্ন’ গ্রহণ করেন, তখন তা ছিল সমগ্র বাঙালির জন্য এক ঐতিহাসিক প্রাপ্তি।
সত্যজিৎ শিখিয়ে গেছেন ক্যামেরা কেবল ছবি তোলে না, ক্যামেরা জীবনকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নীরবতারও ভাষা থাকে। ৩৪ বছর পেরিয়ে গেলেও বাঙালির প্রতিটি গল্পে, প্রতিটি ফ্রেমে এবং প্রতিটি শিল্পের স্পন্দনে আজও বেঁচে আছেন তিনি। মহারাজা, তোমারে সেলাম!
টেলিগ্রাফ স্টোরি