
ফাইল ছবি
উন্নত জীবনের হাতছানি আর দারিদ্র্য বিমোচনের রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে দালালের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছেন দেশের শত শত যুবক। পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ১৫-২০ লাখ টাকা খরচ করে পা বাড়াচ্ছেন অনিশ্চিত পথে। কিন্তু সেই স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই অনেকের জীবনের অবসান ঘটছে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে। একদিকে দালালের পকেট ভারী হচ্ছে, অন্যদিকে একেকটি লাশের ভারে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে অসংখ্য পরিবার।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টাকারীদের মধ্যে ৩৯ শতাংশই বাংলাদেশি। চলতি বছরের ২২ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯০১ জন এই পথে ইউরোপ প্রবেশের চেষ্টা করেছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ জনই বাংলাদেশি যুবক।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীরাই এই ‘ইউরোপ গেম’ বা মরণযাত্রায় সবচেয়ে বেশি সামিল হচ্ছেন। বিশেষ করে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট ও কুমিল্লার মতো জেলাগুলো থেকে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

পাচারকারী চক্র সাধারণত ভ্রমণ ভিসায় আরব আমিরাত, মিসর বা তুরস্ক হয়ে লিবিয়া পৌঁছায়। সেখান থেকে শুরু হয় আসল ‘গেম’। লিবিয়ার গোপন ক্যাম্পে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রেখে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে ভুরিভুরি।
গত ২৭ মার্চ লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে প্রচণ্ড ঠান্ডা ও খাদ্যের অভাবে প্রাণ হারিয়েছেন সুনামগঞ্জের ১৩ জন যুবক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, দালালদের নাম উল্লেখ করে মামলা দিলেও তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
সুনামগঞ্জের ইজাজুল ইসলামের বোন জুলেফা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, “আমার ভাইটা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের ব্যবসা বিক্রি করে ১৫ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সাগরে অনাহারে ও পিপাসায় তার মৃত্যু হলে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। শেষবার ফোনে বলেছিল, সে নৌকায় উঠছে—এটাই ছিল শেষ কথা।”
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই মানব পাচার আইনে ৮১০টি নতুন মামলা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার মামলা ঝুলে আছে, যার মধ্যে এক হাজারেরও বেশি মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়া ও প্রমাণের অভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা দালালচক্রকে আরও সাহসী করে তুলছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির মনে করেন, কেবল প্রচার দিয়ে এই মরণযাত্রা বন্ধ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের সচেতনতামূলক কাজে আরও জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বিষয়টিকে দেশের জন্য ‘ইমেজ ক্রাইসিস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “পরিবার যখন জেনেবুঝে সন্তানদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয়, তখন সরকারের পক্ষে ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতন করা কঠিন। অবৈধভাবে গিয়ে বিপদে পড়লে আইনি সহায়তা দেওয়াও জটিল হয়ে পড়ে।”
মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব আর দালালের প্রলোভনে পড়ে এভাবেই ধ্বংস হচ্ছে একেকটি প্রাণ ও পরিবার। ‘ইউরোপ গেম’ নামের এই মরণখেলা বন্ধ না হলে সাগরের বুকে বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।