
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ঘোষণার সময় তিনি জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত নিতে তাকে অনুরোধ করেছিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘ইরান সরকার ভীষণভাবে বিভক্ত—এই বাস্তবতা বিবেচনায় এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে আমরা আমাদের হামলা স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছি।’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকার জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এটি ছিল সর্বশেষ প্রকাশ্য প্রশংসা—বিশেষ করে মুনিরের জন্য।

৮ এপ্রিল, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এর আগে তৎপর কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে মুনির সরাসরি কথা বলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে।
১১ এপ্রিল, ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদল পৌঁছালে মুনির তাদের স্বাগত জানান। যদিও প্রথম দফার বৈঠকে অগ্রগতি হয়নি, এরপর তিনি তেহরানে তিন দিনের সফরে যান—যুদ্ধ শুরুর পর কোনো আঞ্চলিক সামরিক নেতার এটি ছিল প্রথম সফর।
তবে মুনির আজ শান্তির দূত হিসেবে প্রশংসিত হলেও, তার বৈশ্বিক উত্থানের পেছনে রয়েছে এক বছর আগের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।
যে যুদ্ধ সবকিছু বদলে দেয়
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল, কাশ্মীরের পাহালগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হন। ভারত এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে, যদিও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে। দুই সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
৭ মে ভারত ‘অপারেশন সিন্দুর’ চালিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা করে। জবাবে পাকিস্তান একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে। কয়েকদিনের সংঘর্ষ শেষে ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়।
এই সংঘাতের পর পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামরিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে। মুনির চার-তারকা জেনারেল থেকে ফিল্ড মার্শাল এবং পরে দেশটির প্রথম চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) হন। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধই তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে।
ওয়াশিংটনের দরজা খোলা
১৮ জুন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান—যা ছিল নজিরবিহীন। তিনি মুনিরকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ এবং ‘দক্ষ যোদ্ধা’ বলে অভিহিত করেন।
এর আগে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ায় এবং বিভিন্ন কৌশলগত প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে তারা ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখে—যা তাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সাংবিধানিক পরিবর্তন
২০২৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ২৭তম সংবিধান সংশোধনী পাস করে। এতে সিডিএফ পদ সৃষ্টি হয়, যা সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছেই থাকে। এর ফলে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী একক কমান্ডে আসে।
এই সংশোধনী অনুযায়ী: ফিল্ড মার্শাল পদ আজীবন বহাল থাকবে। সিডিএফকে অপসারণ করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় ভোট প্রয়োজন হবে। মুনিরের মেয়াদ অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ে।
সমালোচকরা অবশ্য বলছেন, এতে ক্ষমতার অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে কৌশল
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে হামলার পর পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এতে এক দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশও প্রতিরক্ষা দেবে। একই সময়ে পাকিস্তান ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আক্রমণের পর ইসলামাবাদ একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, যার ফলেই ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়।
অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাঝেও পাকিস্তানের নিজের দেশে পরিস্থিতি জটিল। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সহিংসতা বেড়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এখনো কারাগারে। গণমাধ্যম ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মুনির কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘এই পর্যায়ে এসে কার্যত মুনির নিজেই নির্ধারণ করবেন তিনি কতদিন সিডিএফ পদে থাকবেন।’