
জাপানের ৭৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন না যে সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে
আগ্নেয়গিরি ও জনপ্রিয় টনকাতসু রামেনের জন্য পরিচিত জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ কিউশু এখন দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালে যুদ্ধ পরিত্যাগের নীতির পর এটাই জাপানের সবচেয়ে বড় সামরিক কৌশলগত রূপান্তর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্চের শেষ দিকে জাপান কিউশুর কুমামোতো অঞ্চলে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চীন পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম—যা জাপানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের নির্দেশক। ২০১৯ সাল থেকে চীনকে জাপান তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
‘সাউদার্ন শিল্ড’ কী?
জাপানের এই নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল ‘সাউদার্ন শিল্ড’ নামে পরিচিত। এর আওতায় Japan Self-Defense Forces (JSDF) দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নানসেই বা রিউকিউ দ্বীপপুঞ্জে, যা কিউশু থেকে শুরু হয়ে তাইওয়ানের খুব কাছাকাছি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দ্বীপগুলো পূর্ব চীন সাগর ও ফিলিপাইন সাগরের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা রেখা তৈরি করেছে।
এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ প্রতিরক্ষা ধারণার অংশ, যার লক্ষ্য চীনের সামরিক বিস্তার প্রশান্ত মহাসাগরে সীমিত রাখা। জাপান আশঙ্কা করছে, পূর্ব চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের বাড়তে থাকা সামরিক তৎপরতা ভবিষ্যতে বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
জাপান তাই ‘কাউন্টারস্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ অর্জনের দিকে এগোচ্ছে—অর্থাৎ হামলার শিকার হলে পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা রাখা। ২০২২ সালে এই নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে জাপান। এর অংশ হিসেবে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কিনছে, যা সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের সংবিধান সামরিক শক্তি ব্যবহারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। তবুও সরকার ধীরে ধীরে আইনের ব্যাখ্যা পরিবর্তন করে সামরিক ভূমিকা বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালে জাপান ‘সম্মিলিত প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ’ অনুমোদন করে—যার ফলে মিত্রদের রক্ষায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এই পরিবর্তনের বড় কারণ শুধু চীন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কমে যাওয়া আস্থা। দীর্ঘদিন ধরে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি জাপানের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এক জরিপে দেখা গেছে, জাপানের ৭৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন না যে সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে।
এছাড়া তাইওয়ান নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাত জাপানের জন্য বড় ঝুঁকি। চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়ে আসছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান সংকট জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে তাই জাপান এখন ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে, জাপান তার প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে—যেখানে লক্ষ্য একদিকে চীনের মোকাবিলা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
‘সাউদার্ন শিল্ড’ কৌশল সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন, যা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।