
অর্থনীতিতে সব ধারণা সমানভাবে টিকে থাকে না- কিছু কিছু সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়, কিছু হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু ধারণা আছে, যেগুলো বারবার ভুল প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারণের টেবিলে ফিরে আসে। এই পুনর্জীবিত, অথচ অকার্যকর ধারণাগুলোকেই বলা হয় “জম্বি ইকোনমিক্স”।
জম্বি ইকোনমিক্স কী?
‘জম্বি ইকোনমিক্স’ বলতে এমন অর্থনৈতিক তত্ত্ব, নীতি বা বিশ্বাসকে বোঝায় যেগুলো বাস্তবে অকার্যকর বা ক্ষতিকর হিসেবে প্রমাণিত হলেও রাজনৈতিক, আদর্শিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কারণে টিকে থাকে। এগুলো যেন মৃত, কিন্তু পুরোপুরি বিলীন হয়নি—নীতিনির্ধারণে ঘুরেফিরে আসে এবং প্রভাব ফেলে।

এর একটি ঘনিষ্ঠ ধারণা হলো ‘জম্বি ফার্ম’—এমন কোম্পানি যারা নিজেদের আয় দিয়ে ঋণের সুদও পরিশোধ করতে পারে না, কিন্তু ব্যাংক ঋণ, সরকারি ভর্তুকি বা নীতিগত সহায়তায় টিকে থাকে।
কেন জম্বি ধারণা টিকে থাকে?
জম্বি ইকোনমিক্সের স্থায়িত্বের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারন রয়েছে:
১. রাজনৈতিক স্বার্থ
অনেক সময় একটি ভুল নীতি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে। ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় হওয়ায় নীতিনির্ধারকরা তা চালু রাখেন।
২. আদর্শিক পক্ষপাত
অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনেক সময় নির্দিষ্ট আদর্শ বা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে তথ্য-প্রমাণের চেয়ে বিশ্বাস বড় হয়ে দাঁড়ায়।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা
একবার কোনো নীতি বা কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হলে তা বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক জটিলতা ও স্বার্থের লেনাদেনা এতে ভূমিকা রাখে।
৪. তথ্যের অপব্যবহার বা ভুল ব্যাখ্যা
কিছু তত্ত্ব আংশিক সত্য বা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে কার্যকর হলেও তা সাধারণীকরণ করে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়।

জম্বি ফার্ম হচ্ছে অর্থনীতির ‘মৃত বোঝা’
জম্বি ফার্ম হলো এমন প্রতিষ্ঠান, যারা বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা হারিয়েছে, কিন্তু তবুও কৃত্রিমভাবে বেঁচে থাকে। এর প্রভাব যথাক্রমে-
উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া: অকার্যকর কোম্পানি সম্পদ দখল করে রাখে
নতুন উদ্যোক্তারা বাধাগ্রস্ত হয়
ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বাড়ে
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়
১৯৯০-এর দশকে জাপানের ‘লস্ট ডিকেড’-এ এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যেখানে ব্যাংকগুলো দুর্বল কোম্পানিকে টিকিয়ে রেখেছিলো।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, এখানকার অর্থনীতিতে জম্বি ইকোনমিক্স ও জম্বি ফার্মের উপস্থিতি নতুন নয়, তবে তা প্রায়শই অদৃশ্যভাবে কাজ করে।
ভারত
ব্যাংকিং সেক্টরে Non-Performing Loans (NPL) বা খেলাপি ঋণের বড় অংশ এসেছে এমন কোম্পানি থেকে যারা কার্যত জম্বি অবস্থায় ছিল। ‘এভারগ্রিনিং’ (পুরনো ঋণ ঢাকতে নতুন ঋণ) একটি পরিচিত সমস্যা। বাংলাদেশ ও নীতিনির্ধারণী জায়গাতে ভুল করে বসলে এমন সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
পাকিস্তান
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান (SOEs) দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চললেও রাজনৈতিক কারনে টিকে আছে—যা কার্যত জম্বি ফার্মের উদাহরণ।
বাংলাদেশ: বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও জম্বি প্রবণতার কিছু লক্ষণ দেখা যায়, যদিও তা সবসময় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয় না।
১. খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকিং খাত
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে উচ্চ মাত্রার খেলাপি ঋণ একটি বড় উদ্বেগ। অনেক প্রতিষ্ঠান বারবার ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের সুবিধা পেয়ে টিকে থাকে।
২. ভর্তুকিনির্ভর শিল্প
কিছু শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। এগুলো যদি নিজস্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করতে না পারে, তবে জম্বি ফার্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৩. রাজনৈতিক অর্থনীতি
ব্যবসা ও রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেক সময় অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখে, যা বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে ব্যাহত করে।
ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
জম্বি ইকোনমিক্স কেবল একটি তাত্ত্বিক সমস্যা নয়—এর বাস্তব প্রভাব রয়েছে-
বিনিয়োগের দক্ষতা কমে যায়
উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হয়
অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়তে পারে
রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পায়
এই সমস্যা মোকাবিলায় কিছু কাঠামোগত পদক্ষেপ জরুরি-
১. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো।
২. বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা: অকার্যকর প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে না রাখা।
৩. নীতিনির্ধারণে তথ্যনির্ভরতা: আদর্শ নয়, বাস্তব ডেটার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
৪. কর্পোরেট গভর্ন্যান্স উন্নয়ন: প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বাড়ানো।
জম্বি ইকোনমিক্স আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব ধারণা যে সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে না, তা নয়। কিন্তু যেগুলো টিকে থাকে, সেগুলো সবসময় জীবন্ত বা কার্যকরও নয়। দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—কোন ধারণা ও প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত, আর কোনগুলোকে বিদায় জানানো জরুরি তা নির্ধারণ করা।
অর্থনীতির সুস্থতার জন্য কখনো কখনো ‘মৃত’ জিনিসকে সত্যিই মরতে দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প