
থালাপতি বিজয়
ঘটনাটি যদি সত্য হয় তাহলে তা হবে রীতিমতো ভূমিকম্পের মতোই। নাকি ভোটকম্প? কারণ কম্পনের উৎপত্তি ভোটের ফল থেকেই হবে। যার আভাস ইতিমধ্যেই কিছুটা পাওয়া যাচ্ছে।
আসছে ৪ মে ভারতের ৫ রাজ্যের ভোটের ফল ঘোষিত হবে। ফল ঘোষণার আগে আসতে শুরু করেছে নানা সংস্থার ভোট জরিপের ফল। আর তাতেই দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে পাওয়া যাচ্ছে ভূমিকম্পের আভাস।
ভারতের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভোট জরিপ সংস্থা এক্সিস মাই ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছে এক বিস্ফোরক তথ্য। যা ভারতের রাজনীতির অঙ্গণে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। তাদের জরিপের ফল বলছে, এবারের তামিলনাড়ুর নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে জিততে চলেছে তামিলাগা ভেত্রি কাজাঘাম (টিভিকে) পার্টি। যে পার্টির বয়স মাত্র দুই বছর। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি দলটির প্রতিষ্ঠা করেন তামিল ছবির মেগাস্টার বিজয় থালাপতি।

দল গঠনের মাত্র দু’বছরের মাথায় এমন সাফল্য! জরিপের ফল সত্যি হলে তা হবে বিস্ময়কর ঘটনা। কারণ এটি গেলো অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তামিলনাড়ুর ক্ষমতার রাজনীতিতে যে দুই দলের দ্বৈরথ চলছে সেটিকে ভেঙে দিয়ে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে বিজয়ের দল টিভিকে।
তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজনীতিতে দুই প্রধান দল ডিএমকে (দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজঘাম) এবং এআইডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজঘাম)। এই দুই দলের মধ্যেই গেলো ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজ্যের ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। জরিপ বলছে, ২৩৪ আসনের তামিলনাড়ু বিধানসভায় এবার সবচেয়ে বেশি আসন পেতে যাচ্ছে বিজয়ের টিভিকে। ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসনে জিততে পারবে কিনা সেটি নিশ্চিত না হলেও রাজ্যের বড় দুইকে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে- এমনটাই ইঙ্গিত জরিপে।
তবে জরিপ যে সসবসময় সত্যি হয় তেমনটা নয়। তবে, যদি হয় তাহলে সেটিকে তামিলনাড়ুতে ‘বিজয়কম্প’ বললে ভুল হবেনা। কারণ এর সিংহভাগ কৃতিত্বই দিতে হবে তামিল মেগাস্টার থালাপতি বিজয়কে। তিনি একাই তার দুই বছর বয়সী দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্য দেশটির অন্যান্য রাজ্যগুলো থেকে রাজনৈতিকভাবে অনেকখানি আলাদা। অন্তত দুটি দিকে দিয়েতো সম্পূর্ণই আলাদা রাজনৈতিক সংস্কৃতি তামিলনাড়ুতে।
প্রথমত, তামিলনাড়ুতে নির্বাচন জেতে আঞ্চলিক দল। ১৯৬৭ সালের পর থেকে বিগত প্রায় ৫৯ বছর ধরে রাজ্যটি শাসন করছে স্থানীয় সব রাজনৈতিক দল। কংগ্রেস কিংবা বিজেপির মতো সর্বভারতীয় দল এই সময়কালে সেখানকার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ভারতের আর কোনো রাজ্যে এমনটা ঘটেনি।
১৯৫২ থেকে প্রথম তিন নির্বাচনে ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলেও এরপর আর তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় যেতে পারেনি। অন্যদিকে আরেক ন্যাশনাল পার্টি বিজেপি’র অবস্থা রীতিমতো ভয়াবহ। ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলটি এখন পর্যন্ত তামিলনাড়ুতে নিজেদের পায়ের তলায় মাটিই খুঁজে পায়নি।
এবার দ্বিতীয় কারণে আসা যাক। গেলো ৫৮ বছর রাজ্যটিতে যারা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তাদের প্রায় অধিকাংশই এসেছেন ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি থেকে। লেখক থেকেও মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার এবং সফল রাজনৈতিক দল গঠনের ইতিহাস আছে সেখানে।

করুণানিধি, জয়ললিতা, রামাচন্দ্রন
এম করুণানিধিকে দিয়ে শুরু। লেখক থেকে রাজনীতিতে আসা করুণানিধি সর্বোচ্চ সময় (প্রায় ২০ বছর) তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ডিএমকে (দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজঘাম) বর্তমানে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল। মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন তার ছেলে এম কে স্ট্যালিন।
১৯৭৭ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন এম জি রামাচন্দ্রন। তিন দফায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে আসার আসে রামাচন্দ্রন ছিলেন তামিল ইন্ড্রাস্টির বিখ্যাত অভিনেতা, পরিচালক এবং প্রযোজক।
জয়ললিতার কথাতো আমাদের অনেকেরই জানা। তামিল ছবির তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা থেকে নাম লেখান রাজনীতিতে, গঠন করেন নিজের দল এআইডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজঘাম)। তুমুল সাফল্য পান জয়ললিতা। ছয়বার হন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী।
ফাঁকে স্বল্প মেয়াদে আরও দুজন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন- জানাকি রামচন্দ্রন এবং ভি আর নেদুনচেজিয়ান। জানাকি রামচন্দ্রন ছিলেন তামিল ছবির অভিনেত্রী এবং ভি আর নেদুনচেজিয়ান ছিলেন একজন লেখক।
এ থেকেই বোঝা যায় তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ফিল্ম স্টাররা কতটা প্রভাব রাখেন। ফলে সেখানকার মুভি স্টারদের চোখ বরাবরই রাজনীতির দিকেও থাকে।

কমল হাসান ও রজনীকান্ত
ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রির জনপ্রিয়তাকে পূঁজি করে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সফল হওয়ার একাধিক উদহারন যেমন আছে তেমনি আছে ব্যর্থতার ইতিহাসও। তামিল ছবির সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা রজনীকান্ত এবং সুপারস্টার কমল হাসান সেই দলের। রজনীকান্ত যদিও রাজনীতিতে নামার ঘোষণা দিয়েও পরবর্তীতে শারীরিক কারণ দেখিয়ে এক পর্যায়ে পিছু হটেন। তবে কমল হাসান এখনো আছেন রাজনীতির ময়দানে। যদিও পূর্বসূরীদের মতো তিনি সাফল্য পাননি। ব্যর্থই বলা চলে।
এবার থালাপতি বিজয়ের পালা। জরিপ সত্য হলে তিনি হাঁটবেন করুণানিধি ও জয়ললিতার পথে।
তামিলনাড়ুর মানুষের মুভি এবং মুভিস্টারপ্রীতির কথা আগেই বলা হয়েছে। যে কারণে রাজ্যটিতে প্রায় অধিকাংশ সময়ই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন সিনেমা থেকে রাজনীতিতে আসা তারকারা। তবে মাঝে দশ বছর যে দুজন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন পালানীস্বামী এবং এম কে স্ট্য্যালিন- তারা সিনেমার মানুষ নন। যা তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে কিছুটা বেমানানই বলা চলে।
তবে কি বিজয় থালাপতিকে দিয়ে আবারও পুরনো অভ্যাসে ফিরতে যাচ্ছেন তামিলনাড়ু!
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল