
নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন – ন্যাটো
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ঘিরে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কে টানাপোড়েন গভীর হওয়ার মধ্যে জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে ন্যাটো। শনিবার (০২ মে) সামরিক জোটটি এ তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এ ঘোষণা আসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের প্রকাশ্য বাকযুদ্ধের পর। সোমবার মের্ৎস বলেছিলেন, আলোচনার টেবিলে ইরান ওয়াশিংটনকে ‘অপমান’ করছে। জবাবে ট্রাম্প বলেন, মের্ৎস ‘কী বলছেন, তা তিনি নিজেই জানেন না।’
এ ঘোষণার সময়ই ট্রাম্প জানান, গত গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়ন মেনে চলেনি- এ অভিযোগে আগামী সপ্তাহ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর গাড়ি ও ট্রাকের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন র্পানলে শুক্রবার বলেন, জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের কাজ ‘আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে’ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ইউরোপে বাহিনীর অবস্থান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ন্যাটো সদস্য জার্মানিতে ৩৬ হাজার ৪৩৬ জন সক্রিয় মার্কিন সেনা ছিল। তুলনায় ইতালিতে ছিল ১২ হাজার ৬৬২ জন এবং স্পেনে ৩ হাজার ৮১৪ জন।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিসটোরিউস শনিবার বলেন, ইউরোপ এবং জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ‘প্রত্যাশিতই ছিল।’
ন্যাটো জানিয়েছে, ‘জার্মানিতে বাহিনীর অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত বুঝতে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করছি।’
জোটের মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘এ সমন্বয় ইউরোপের জন্য প্রতিরক্ষায় আরও বেশি বিনিয়োগ এবং যৌথ নিরাপত্তার দায়িত্বের বড় অংশ নিজেদের কাঁধে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
দুই মেয়াদেই ট্রাম্প জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় মিত্রদেশে মার্কিন সেনা সংখ্যা কমানোর হুমকি দিয়েছেন। তার যুক্তি, ইউরোপকে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে হবে।
এখন তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সমর্থন না দেওয়া কিংবা হরমুজ প্রণালিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অংশ না নেওয়া মিত্রদের ‘শাস্তি’ দিতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে। ইরানের বাহিনী কার্যত ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে রেখেছে।
ট্রাম্প শুক্রবার আরও অভিযোগ করেন, মার্সিডিস বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউ’র মতো জার্মান গাড়ি নির্মাতারা আমেরিকানদের ‘ঠকাচ্ছে’। তিনি বলেন, জার্মানি ও ‘অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ’ বাণিজ্য চুক্তি মানেনি।
গাড়ির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ হলে জার্মানি বড় ধাক্কা খেতে পারে, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট গাড়ি রপ্তানির উল্লেখযোগ্য অংশই দেশটির।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের বিরোধিতা করায় ইতালি ও স্পেন থেকেও মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইতালি আমাদের কোনো সাহায্য করেনি, আর স্পেন ছিল ভয়াবহ, একেবারে ভয়াবহ।’
সেনা প্রত্যাহার করবেন কি না—এ প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, সম্ভবত করব। কেন করব না?’
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাদেফুল বৃহস্পতিবার মরক্কো সফরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কমানোর সম্ভাবনার জন্য জার্মানি ‘প্রস্তুত’ এবং বিষয়টি ন্যাটোর সব ফোরামে ‘বিশ্বাসের পরিবেশে ঘনিষ্ঠভাবে’ আলোচনা হচ্ছে।
তবে তিনি বলেন, জার্মানিতে বড় মার্কিন ঘাঁটিগুলো ‘কোনোভাবেই আলোচনার বিষয় নয়’। উদাহরণ হিসেবে তিনি রামস্টাইন এয়ার বেইসের কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি উভয়ের জন্যই ‘অপরিবর্তনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা’ পালন করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৃহস্পতিবার বলেছে, ইউরোপে মার্কিন সেনা মোতায়েন ওয়াশিংটনের নিজের স্বার্থেই এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র ‘গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’।
তবে ট্রাম্প আবারও মের্ৎসকে আক্রমণ করে বলেন, ইরান বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ’ না করে তার উচিত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মনোযোগ দেওয়া।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকেই ইউরোপীয় শক্তিগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গত এক বছরে একাধিক ড্রোন অনুপ্রবেশ এবং ইউরোপ রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে আসার মার্কিন ইঙ্গিত বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে।
মের্ৎস জাতীয় নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহু বছর ধরে অর্থসংকট ও সরঞ্জামঘাটতিতে থাকা সেনাবাহিনীতে নজিরবিহীন বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ইউক্রেনের প্রতিও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।