
তবে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা বাড়ালেও এর একটি অপ্রত্যাশিত প্রভাব পড়েছে ইউক্রেনের ওপর। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন কিছু ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, আর সেই সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কি এখন আগের চেয়ে বাড়ছে?
গত মার্চে সৌদি আরব সফরে যান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সেখানে তিনি বলেন, তার লক্ষ্য ‘মানুষের জীবন রক্ষা জোরদার করা’। তবে ওই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে ইউক্রেনের ড্রোন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা। ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের সঙ্গে ইতোমধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি ও সহযোগিতা চুক্তি করেছে কিয়েভ। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তারা এসব দেশকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করতে চায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অংশীদারিত্ব আরও বাড়াবে।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি খুব একটা অনুকূল ছিল না। এতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ সরে যায় এবং রাশিয়া বাড়তি সুবিধা পায় তেল বিক্রিতে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়, যার ফলে মস্কোর আয় বাড়ে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও শক্তিশালী হয়।
তবে ইউক্রেন আবারও পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত ড্রোন প্রযুক্তির দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তারা নতুন মিত্র তৈরি করছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি নরওয়ে ও জার্মানির সঙ্গে বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, যেখানে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
একই সঙ্গে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। নিজস্ব তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে তারা তেল স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি, এতে রাশিয়ার জ্বালানি খাতে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং এক পর্যায়ে তাদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে ইউক্রেন সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে বড় একটি ঋণ অনুমোদন পেয়েছে, যা অস্ত্র ক্রয় ও উৎপাদনে কাজে লাগানো হবে। এই ঋণ আগে আটকে ছিল।
তবে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে দ্রুত সমাধান সম্ভব। তবে বাস্তবে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধিরা এখনো কিয়েভ সফর করেননি, যা তিনি অসম্মানজনক বলে মনে করেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন যুদ্ধ থামানোর কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি। বরং ইরান যুদ্ধের সুযোগে ইউক্রেনে হামলা আরও জোরদার করেছে মস্কো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার অর্থনীতি চাপে থাকলেও তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি এবং দেশটি এখন যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনা কঠিন। তবে ইউক্রেন এখন আগের তুলনায় কৌশলগতভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবুও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—যদি যুদ্ধবিরতি হয়, তাহলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং রাশিয়া ভবিষ্যতে আবার আক্রমণ করবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে।
ইরান যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, আর সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেই ইউক্রেন নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত, তবে কিয়েভ আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত—কূটনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তি—সব দিক থেকেই। এখন দেখার বিষয়, এই পরিবর্তন সত্যিই শান্তির পথ তৈরি করে কিনা, নাকি সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়।
বিবিসি
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প