
পানির মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করবে সজনে বীজ
বিশ্বজুড়ে খাবার পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ যখন এক ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, ঠিক তখনই এক আশার আলো দেখাচ্ছে আমাদের অতি পরিচিত সজনে গাছ (মরিঙ্গা)। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সজনে বীজের নির্যাস ব্যবহার করে পানি থেকে প্রায় ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিকারক মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করা সম্ভব।
রোববার (৩ মে) ব্রাজিল ও যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক গত এপ্রিলে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। এতে জানানো হয়, দ্রুত বর্ধনশীল এই উদ্ভিদের বীজ প্রাকৃতিক ‘কোয়াগুল্যান্ট’ হিসেবে কাজ করে। এর বিশেষ উপাদান পানিতে ভাসমান অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে একত্রিত করে ফেলে, ফলে সেগুলো সহজে ছেঁকে আলাদা করা যায়।
সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনসালভেস জানান, হাজার বছর ধরে পানি বিশুদ্ধ করতে সজনে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক গবেষণায় এর এই নতুন কার্যকারিতা সামনে এল। পরীক্ষায় মানুষের চুলের পুরুত্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আকারের পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করে দেখা গেছে, এটি ট্যাপের পানি থেকে ৯৮.৫ শতাংশ পর্যন্ত দূষণমুক্ত করতে সক্ষম।

পানিতে ভাসমান অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলোকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে সজনে বীজ
কেন এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৮৩ শতাংশ ট্যাপের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়, যা মানুষের রক্ত ও মস্তিষ্কেও পৌঁছে গেছে। এর ফলে প্রজনন সমস্যা ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রচলিত অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক রাসায়নিক শোধন পদ্ধতির চেয়ে সজনে বীজ অনেক বেশি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং মানবদেহের জন্য কম বিষাক্ত।
সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা
নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন জানান, এটি একটি টেকসই বিকল্প হলেও বড় পরিসরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন—একটি সজনে বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি শোধন করা গেলেও মেগাসিটির পানি শোধনের জন্য বিপুল পরিমাণ বীজের প্রয়োজন হবে। এছাড়া পানিতে জৈব অবশিষ্টাংশ জমার ঝুঁকিও থেকে যায়। ন্যানোপ্লাস্টিকের মতো আরও ক্ষুদ্র কণার ক্ষেত্রে এটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও স্বল্প আয়ের অঞ্চলগুলোতে যেখানে আধুনিক শোধন ব্যবস্থা নেই, সেখানে সজনে বীজ হতে পারে এক যুগান্তকারী সমাধান।
প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিশরীয়দের ব্যবহৃত এই প্রাকৃতিক পদ্ধতিই এখন ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠছে।