
নির্বাচনে একদল জিতবে, আরেক দল হারবে- রাজনীতিতে এটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও পশ্চিমবঙ্গের এবারের জয়-পরাজয়কে সেই নিক্তিতে মাপা যাচ্ছেনা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। যা শুধু বিজেপি নয়, বরং পুরো ভারত বর্ষের রাজনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর আগে প্রায় ৭৫ বছর পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ছিল তিনটি দল। ন্যাশনাল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস। এরমধ্যে কংগ্রেস ছিল প্রথম দিককার ২৫ বছর, মাঝে বামফ্রন্ট্রের ৩৪ বছর এবং পরবর্তীতে তৃণমূল ১৫ বছর। এই সময়কালের অন্তত ৭০ বছর দৃশ্যপটে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল বিজেপি।
স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি তাদের এবারের এই বঙ্গ জয়কে নিজেদের বড় সফলতা হিসেবে দেখছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসতে পারাটা তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং চেষ্টার ফসল। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানকে উৎসবে রূপ দিতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ প্রায় পুরো বিজেপি নেতৃত্বই চলে এসেছে কলকাতায়।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মমতা ব্যানার্জীর একসময়কার ডান হাত হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু অধিকারী। সাম্প্রতিক সময়ে যে শুভেন্দু, মমতা ব্যানার্জীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছেন। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী বললে কম বলা হবে কারণ তাদের বর্তমান সম্পর্ক পুরোপুরি সাপে-নেউলে।
শুভেন্দু এবারের নির্বাচনে মমতাকে তার ঘরের আসন ভবানীপুরে একরকম ঘোষণা দিয়ে হারিয়েছেন। অবশ্য এবারই প্রথম নয় গত নির্বাচনেও তিনি মমতাকে আরেক আসন নন্দীগ্রাম থেকে পরাজিত করেছিলেন।
নির্বাচনে একদল জিতবে, আরেক দল হারবে- রাজনীতিতে এটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও পশ্চিমবঙ্গের এবারের জয়-পরাজয়কে সেই নিক্তিতে মাপা যাচ্ছেনা। কারণ মমতা ব্যানার্জী, নিজের ও দলের এই পরাজয়কে মেনে নেননি। নির্বাচনে বিজেপি জালিয়াতি এবং ‘ভোট লুট’ করেছে এমন অভিযোগ তুলে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগও করেননি। যদিও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সেখানকার বিধানসভা ভেঙে দিয়েছেন। মমতাকে এক রকম বরখাস্তই করেছেন বলা চলে।
নিজের রাজনীতি ঠিকিয়ে রাখার জন্য মমতা ব্যানার্জী হার্ডলাইন বেছে নিলেও সামনের দিনগুলো তার এবং তার দলের জন্য ভীষণ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলকে একজোট রাখা এবং ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা।
কারণ ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরের কিছু অসন্তোষের খবর বাইরে এসেছে। নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে মমতার প্রথম বৈঠকেই অনুপস্থিত ছিলেন অন্তত ১০ জন বিধায়ক। আগামী দিনগুলোতে যা হয়তো আরও বাড়বে।
মমতা ব্যানর্জীসহ তার দলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতা নির্বাচনে হেরেছেন। এটিও দলটির জন্য এক বড় ধাক্কা। বিশেষত মমতা ব্যানার্জীর নিজের পরাজয়। এই পরাজয় দলটির নেতা-কর্মীদের মানসিকভাবে দুর্বল করেছে। পাশাপাশি নির্বাচনে হারায় মমতা ব্যানার্জী বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে থাকতে পারছেন না। তবে যদি তিনি বিধানসভায় যেতে চান তাহলে একটিমাত্র উপায় তার জন্য খোলা আছে। নিজের দলের একজন নির্বাচিত বিধায়ককে পদত্যাগ করিয়ে সেই আসনের উপ-নির্বাচনে জিতে আসতে হবে তাকে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায়, এ অবস্থায় উপ-নির্বাচনে জিতে আসাটা তার জন্য শুধু কঠিনই অনেকটা অসম্ভবই বলা চলে। ফলে বিধানসভায় মমতা থাকতে পারছেন না সেটা মাথায় নিয়েই সেখানকার রাজনীতি করতে হবে তুণমূলকে। কিন্তু মমতার পেছনে থেকে লড়াই করা আর মমতাহীন লড়াই- দুটো ভিন্ন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা সামলাতে তৃণমূল কতোটা প্রস্তুত, তা সময়ই বলবে।
তবে তৃণমূল নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে, তাদের সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। বিজেপি নিজেদের সব রকম দিয়ে তৃণমূলের ডানা ছাঁটার চেষ্টা করবে। সেই ইঙ্গিত নতুন মুখ্যমন্ত্রী কয়েক দিন আগেই দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, রাজ্যে সবাই রাজনীতি করতে পারবে। কিন্তু তৃণমূলকে দেখে নেবো। এখন, তিনি ও তার দল কিভাবে তৃণমূলকে দেখে নেবেন তার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, শুভেন্দু অধিকারী যেহেতু তৃণমূল থেকে বিজেপিতে এসেছেন এবং তার সেসময়ের আসাটা তত মসৃন ছিলনা, ফলে তৃণমূলের ওপর তার রাগ-ক্ষোভের প্রকাশটা বেশি হতে পারে। তাছাড়া শুভেন্দু অধিকারী আগ্রাসি এবং কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এও বলছেন, একসময় তৃণমূলের বড় শক্তি ছিল তৃণমূল পর্যায়ে দলটির সংগঠন। মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী কিংবা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো নেতারা শুধু রাজনৈতিক মুখই ছিলেন না, তারা সংগঠনের ভিতও শক্ত করেছিলেন। এখন সেই জায়গায় বড় ধরণের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মমতার পর উল্লেখযোগ্য তেমন নেতৃত্ব নেই। দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড তার ভাতিজা অভিষেক বন্দোপাধ্যায়, যাকে নিয়ে দলের মধ্যেই নানা বিভেদ বিদ্যমান।
তৃণমূলের আরেকটি বড় সংকট- আদর্শিক । বিজেপি এবং কংগ্রেস কিংবা বামফ্রন্ট এই দলগুলোর প্রত্যেকটির নিজস্ব একটি রাজনৈতিক দর্শন তথা আদর্শ আছে। যে আদর্শ প্রতিটি দলের নিজস্ব শক্তি। কিন্তু তৃণমূলের সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই। তাদের রাজনৈতিক পূঁজি ছিল সেসময়কার ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টের বিরোধীতা। আর দলটির সৃষ্টি হয়েছিল কংগ্রেস ভেঙে। মমতা ব্যানার্জীসহ নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগই সেসময় এসেছেন কংগ্রেস থেকে। পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসার পর কংগ্রেসের ওপর আরেক দফা চড়াও হয় দলটি। বর্তমানে তৃণমূল যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সেটি মূলত কংগ্রেসের পাঠাতন। পরবর্তীতে ক্ষমতাহারা বামফ্রন্ট থেকেও কেউ কেউ ভিড়েছেন দলটিতে। ফলে আজ যে তৃণমূল কংগ্রেস তা মূলত কংগ্রেস এবং অন্যান্য দল থেকে আসা কিংবা ভাগিয়ে আনাদের একটি প্ল্যাটফর্ম।
আর কে না জানে, প্ল্যাটফর্ম সবসময়ই একটি সাময়িক স্থান। ফলে অনেকেই মনে করছেন, সামনের কঠিন সময়ে তৃণমূলের ভাঙণ অনেকটা অবশ্যম্ভাবী। বিজেপি এবং শুভেন্দু অধিকারীরা প্রথম থেকেই সেদিকটায় নজর দেবে। আর কাজটা তাদের জন্য তেমন কঠিনও হবেনা। কারণ- প্রথমত, সেই আদর্শিক সংকট। তৃণমূল তৈরিই হয়েছে অন্যদলের লোকবলে। আর দ্বিতীয়ত- আজকের শুভেন্দু অধিকারীর অন্য দল ভাঙানোর ট্রেনিং মমতার কাছ থেকেই পেয়েছেন।