
বাংলাদেশের ঝর্ণা রানী খৈয়াছড়া
আকাশজুড়ে মাঝেমধ্যেই দেখা যাচ্ছে মেঘের ঘনঘটা। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে প্রকৃতি যখন তার সবটুকু সবুজ ঢেলে সাজিয়েছে নিজেকে, ঠিক তখনই পাহাড়ের বুক চিরে জেগে উঠেছে এক রূপবতী জলধারা—খৈয়াছড়া। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এই ঝর্ণাটি কেবল একটি জলপ্রপাত নয়, যেন পাহাড়ের অন্দরে লুকিয়ে থাকা এক রূপকথার রাজপ্রাসাদ। সেখানে আছে বেশ কয়েকটি ঝর্ণা। সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত আছে, কেউ বলে ৭টা, আবার কেউ বলেন ১১/১২টা ঝরনা রয়েছে। এই ঝর্ণাগুলোর প্রতিটি পরতে মিশে আছে এক অপার্থিব প্রশান্তি, যার কারণে একে ডাকা হয় ‘বাংলাদেশের ঝর্ণা রানী’।
ধারণা করা হয় প্রায় ৫০ বছর আগে থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে খৈয়াছড়া ঝর্ণাটি।জনমানহীন পাহাড়ি এলাকা এবং ঝোপ ঝাড়ের আধিক্যের জন্য এটির অবস্থান আবিষ্কারে সময় লেগেছে। আবার অনেকে ধারণা করেন প্রায় ৫০ বছর আগে পাহাড়ি ঢলের ফলে এই ঝর্ণাটি তৈরি হয়েছে, এর পূর্বে এখানে ঝর্ণাটি ছিল না।
২০১০ সালে সরকার বারৈয়াঢালা ব্লক থেকে কুণ্ডের হাট (বড়তাকিয়া) ব্লকের ২৯৩৩.৬১ হেক্টরর পাহাড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করায় খৈয়াছড়া ঝর্ণা জাতীয় উদ্যানের আওতাভুক্ত হয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের “রামগড়-সীতাকুন্ড- রিজার্ভ ফরেস্টের” খৈয়াছড়া ঝর্ণাকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার অন্যতম মূল লক্ষ্য হল খৈয়াছড়া ঝর্ণার সংরক্ষণ।

ঝর্ণাগুলোর প্রতিটি পরতে মিশে আছে এক অপার্থিব প্রশান্তি, যার কারণে একে ডাকা হয় ‘বাংলাদেশের ঝর্ণা রানী’
পথ যেখানে রোমাঞ্চের গল্প বলে
ছুটির দিন কার না মন চায় বেড়াতে? তাই বন্ধুরা ঠিক করলাম খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যাব। যেই ভাবা সেই কাজ। অফিস শেষ করে রাতের ট্রেন ধরে বন্ধুরা মিলে চলে গেলাম খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে।
বড়তাকিয়া বাজার থেকে মাত্র ৪.২ কিলোমিটার দূরেই এই মায়াবী ঝর্ণার অবস্থান। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি কিছু লোক ছোট ছোট বাঁশ বিক্রি করছে। যারাই ঝর্ণার দিকে যাচ্ছে, সবার হাতেই বাঁশ। আমরাও পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে নিলাম বাঁশ। এই বাঁশ ছাড়া আপনি হাঁটতে পারবেন না। যত ভেতরে যাবেন, তত গভীর কর্দমাক্ত মাটি। সেই সঙ্গে ঝর্ণার পানির স্রোত। সব মিলিয়ে আপনার ভারসাম্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই খৈয়াছড়া যাওয়ার আগে অবশ্যই পায়ের জন্য এ্যাঙ্কলেট এবং হাতে একটা করে শক্ত লাঠি কিংবা বাঁশ নিয়ে যেতে হবে।
যেখানে গাড়ি নামিয়ে দিয়েছিল, সেখান থেকে খাবারের হোটেল পর্যন্ত পৌঁছাতে আরও পাঁচ মিনিট হাঁটতে হয়। এরপর এসব হোটেলে দুপুরের খাবার অর্ডার করে যেতে হয়। মোবাইল, ব্যাগ সবকিছু হোটেলের লকারে জমা রেখে যেতে পারবেন। আমরাও তাই করেছিলাম।

ঝিরিপথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করলেই শুরু হয় আসল রোমাঞ্চ
গ্রামের কর্দমাক্ত মেঠো পথ ধরে হাঁটা শুরু করলাম, দুধারে দেখবেন ধানের ক্ষেত আর সতেজ ঘাসের গন্ধ। বাঁশের সাঁকো আর ঝিরিপথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের গভীরে প্রবেশ করলেই শুরু হয় আসল রোমাঞ্চ। কোথাও ঝর্ণার পানি, কোথায় হাঁটুসমান কাদা। অনেকে আবার পিচ্ছিল কাদায় স্লিপ খেয়ে পড়ে গেছে। খুব সতর্কভাবে পা দিতে হয়। পাহাড়ের মাটিগুলো এত শক্ত, যেন পাথর। যেতে যেতে কখনো ঝর্ণার পানির স্রোত দেখে মন জুড়ায়। পাহাড়ী ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মের আড়াল থেকে যখন ঝর্ণার শব্দ কানে আসে, তখন পথের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষেই মুছে যায়।
এখানে অনেকগুলো ঝর্ণা রয়েছে। বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন মত পেয়েছি। কেউ বলে সাতটা, আবার কেউ বলে ১১টা ঝরনা রয়েছে। তবে প্রথম ঝর্ণাটা নিচে বলে সকলে একটু কষ্ট করলেই দেখতে পারে। এরপরের ঝরনাগুলো দেখতে হলে অনেকটা ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ দ্বিতীয় ঝরনা থেকে সব কটি পাহাড়ের ওপর। যত উঁচুতে যাবেন, তত ঝর্ণা। বৃষ্টির দিন সবকিছু পিচ্ছিল। প্রথম ঝর্ণায় প্রচুর মানুষ। কারণ, এতটুকুই আসে বেশির ভাগ মানুষ। পর্যটকদের ৯৫ শতাংশ এখান থেকেই তৃপ্তি নিয়ে ফিরে যায়।
আমরা গিয়েছিলাম একদম শেষ চূড়া পর্যন্ত। খৈয়াছড়ার সর্বশেষ ধাপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ ফুট ওপরে। এখানে ওঠা খুবই কষ্টসাধ্য। তবে উঠতে পারলে ঝুলিতে ভরতে পারবেন বাড়তি একটি পাওনা। তা হলো পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরের সমুদ্র।

খৈয়াছড়ার সর্বশেষ ধাপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ ফুট ওপরে
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে:
বাজার থেকে ঝরনা: বড়তাকিয়া বাজার থেকে সিএনজিতে ১০০ টাকা ভাড়ায় ঝিরিপথ পর্যন্ত যাওয়া যায়। এরপর শুরু হবে আপনার সেই কাঙ্ক্ষিত ১.৫ ঘণ্টার পাহাড়ী ট্র্যাকিং।
বর্ষার রূপ যেমন সুন্দর, পাহাড়ের পথ ততটাই চঞ্চল ও পিচ্ছিল। এই বৃষ্টির মৌসুমে পাহাড়ে যেতে হলে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক:

প্রথম ঝর্ণায় প্রচুর মানুষ হয় কারণ, এতটুকুই আসে বেশির ভাগ মানুষ
খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রাম
ঝরনার পথে বেশ কিছু স্থানীয় হোটেল রয়েছে। যাওয়ার সময় আপনি আপনার পছন্দমতো খাবারের অর্ডার দিয়ে যেতে পারেন। পাহাড়ী মুরগি আর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের স্বাদ আপনার এই বুনো ভ্রমণকে পূর্ণতা দেবে। তবে মনে রাখবেন, বিকেল ৫টার পর এখানকার অধিকাংশ দোকান বন্ধ হয়ে যায়। রাতে থাকতে চাইলে সীতাকুণ্ডে ফিরে এসে ৩০০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে মানসম্মত হোটেলে (যেমন: সৌদিয়া বা সাইমুন) বিশ্রাম নিতে পারেন।
প্রকৃতির কাছে দায়বদ্ধতা
পাহাড় আমাদের প্রশান্তি দেয়, বিনিময়ে আমরা যেন তাকে আবর্জনা না দিই। চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিন ঝরনায় ফেলে পরিবেশ নষ্ট করবেন না। প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করুন এবং ঝর্ণা রানীকে তার আপন রূপে বেঁচে থাকতে দিন।
বর্ষার ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজে খৈয়াছড়ার শীতল পানিতে যখন আপনি গা ভেজাবেন, তখন মনে হবে—জীবন আসলেই সুন্দর, যদি তার বাঁকে বাঁকে এমন পাহাড়ী রোমাঞ্চ থাকে।
ভিজুয়াল স্টোরি