
দেশটিকে ‘শত্রু ঘাঁটি’ হিসেবে দেখছে ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান এখন ক্রমশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-কে সরাসরি লক্ষ্য করে কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার হামলা শুরু করলে ইউএই আরও বড় ধরনের হামলার মুখে পড়তে পারে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলি খেজরিয়ান সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, “আমিরাতের সঙ্গে আমাদের ‘প্রতিবেশী’ সম্পর্ক আপাতত শেষ। এখন দেশটিকে ‘শত্রু ঘাঁটি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।”
ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ও ইউএইকে উদ্দেশ করে কঠোর বার্তা দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছে, আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠছে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
কেন ইউএইকে টার্গেট করছে ইরান?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, ইউএইতে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। আবুধাবির কাছে আল-ধাফরা ঘাঁটিতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা ও উন্নত রাডার ব্যবস্থা মোতায়েন আছে।
দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালে ইউএই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ সই করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এরপর দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে।
বর্তমান সংঘাতের সময় ইসরায়েল ইউএইতে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠিয়েছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেছেন, এটি ইসরায়েল-ইউএইর “অসাধারণ সম্পর্কের” অংশ।
ইরানের দৃষ্টিতে, এসব পদক্ষেপ ইউএইকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের অংশে পরিণত করেছে।
এছাড়া ইরান ও ইউএইর মধ্যে দীর্ঘদিনের আরেকটি বড় বিরোধ হলো হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থিত তিনটি দ্বীপ—গ্রেটার টুনব, লেসার টুনব ও আবু মুসা।
১৯৭১ সাল থেকে দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইউএই সেগুলোর মালিকানা দাবি করে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাকে ঘিরে উত্তেজনা বহুদিনের।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সম্প্রতি দাবি করেছে, ইউএইর গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ বন্দর হরমুজ প্রণালীর এমন অংশে অবস্থিত যেখানে ইরানের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর ইসরায়েলি গণমাধ্যমে খবর আসে, ইউএইর যুদ্ধবিমান ইরানের কেশম দ্বীপে একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। তবে ইউএই কর্মকর্তারা এটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেন।
এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও সামাজিকমাধ্যম ঘন ঘন অভিযোগ করতে থাকে যে, ইউএই গোপনে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় জড়িত থাকতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ ইরানের তেল স্থাপনা ও দ্বীপে বিস্ফোরণের ঘটনায় ইউএইর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। যদিও ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি ইউএইকে দায়ী করেননি।
পাল্টা হামলা ও সম্পর্কের অবনতি
ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউএই, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলার শিকার হয়েছে ইউএই।
অন্যদিকে, ইউএইও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটি বহু ইরানির ভিসা বাতিল করেছে, ইরানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করেছে এবং বাণিজ্য ও অর্থ লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এর ফলে ইরানের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়েছে। আগে চীনসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য ইউএইর বন্দর হয়ে ইরানে প্রবেশ করত। এখন সেই পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন ইউএইকে শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। তাই যুদ্ধের ভাষা ও কৌশলে দেশটিকে বেশি করে টার্গেট করা হচ্ছে।
এই উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন সংকটে পড়তে পারে।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল