
গ্রুপ সি-তে মরোক্কো, স্কটল্যান্ড এবং হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল ফেভারিট হিসেবেই নামবে
পাঁচটা তারার আলো কখনও নেভে না। শুধু কখনও কখনও সেই আলো কুয়াশার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। তবে সেই পাঁচটা তারা এবার হয়ে যেতে পারে ছয়!
কারো কারো কাছে ফুটবলের আরেক নাম ব্রাজিল। সাম্বার তালে তালে যারা বিশ্ব কাঁপিয়ে নিয়ে নেয় বিশ্বকাপ।
পৃথিবীর ফুটবল মানচিত্রে যারা শুধু একটি দেশ নয়, বরং ভিন্ন এক অনুভূতি। সাম্বার তালে নেচে ওঠা হলুদ জার্সি, রাস্তায় খালি পায়ে বল জাগলিং করা শিশুরা, আর “জোগা বনিতো” নামের এক শিল্পদর্শন যেখানে ফুটবল কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, সৌন্দর্যেরও আরেক নাম- দ্যা জিঙ্গা প্লে-মেকার
ফুটবল সম্রাট পেলের জন্মভূমি, যিনি যুদ্ধকে বদলে দিয়েছিলেন শান্তিতে। বিশ্বে মাত্র দুজন খেলোয়াড়ের সম্মানে যুদ্ধবিরতি হয়। এই দুজনের প্রথম জনের নাম পেলে। যার খেলা দেখার জন্য গোটা একটা গৃহযুদ্ধ বিরতিতে যায়। হ্যাঁ, নাইজেরিয়ান বায়াফ্রা সিভিল ওয়ার বিরতিতে গিয়েছিলো ১৯৬৯ এর ফেব্রুয়ারীতে শুধুমাত্র পেলেকে মাঠে খেলতে দেখবে বলে।
যাই হোক, তবে সৌন্দর্যও কখনও কখনও ভেঙে পড়ে। ২০১৪ সালের মারাকানা এখনও ব্রাজিলিয়ানদের দুঃস্বপ্নে ফিরে আসে। সেই ৭-১ শুধু একটি স্কোরলাইন ছিল না; সেটা ছিল এক জাতির করুণ গোঙ্গানির নিঃশব্দ ইতিহাস। তারপর এসেছে বেলজিয়াম, এসেছে ক্রোয়েশিয়া—প্রতিবারই কোয়ার্টার ফাইনালে দাঁড়িয়ে ব্রাজিল যেন নিজের ছায়ার কাছেই হেরে গেছে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি যেন অনেকদিন ধরেই নিজের পুরোনো আয়নায় হারিয়ে যাওয়া মুখ খুঁজছে। এবার সেই হারানো ঐতিহ্য খুঁজে ফেরার দায়িত্ব এসেছে আঞ্চেলোত্তির কাঁধে।
ফুটবল ইতিহাসে খুব কম কোচই আছেন, যাদের ড্রেসিংরুমে উপস্থিতিই নীরব আস্থার প্রতীক। আনচেলোত্তি তাদেরই একজন। তিনি বৈপ্লবিক তবে ভারসাম্য ভালোবাসেন। আর এই ব্রাজিল দলটার এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় প্রয়োজনও সম্ভবত সেটাই—ভারসাম্য। কারন প্রতিভার অভাব এই দলে কখনও ছিল না।
সামনের সারিতে আছেন ভিনিশাস জুনিয়র- যার গতি কখনও কখনও ডিফেন্ডারদের যুক্তিবোধ কেড়ে নেয়। আছেন রাফিনহা, যার বাঁ পা যেন বিষাক্ত বাঁশির ন্যায়। আছেন গ্যাব্রিয়েল মারটিনেল্লি, জাও পেদ্রো, এন্ড্রিক- এক প্রজন্ম, যারা ইউরোপের সবচেয়ে দ্রুতগতির ফুটবলে নিজেদের শানিয়ে তুলছে। তবু এই দলের ভাগ্যাকাশে সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্নটির নাম এখনও নেইমার। এক পিঠে মাঠের খেলায় কৌশলী নেইমার যেন পারস্যের গদ্য অন্য পিঠে ইনজুরির এক অসমাপ্ত উপন্যাস।
একসময় যাকে ব্রাজিল নতুন পেলের উত্তরসূরি ভেবেছিল, সেই নেইমার এখন নিজের শরীরের সঙ্গেই যুদ্ধ করছেন। চোট তাকে থামিয়েছে, সময় তাকে ধীর করেছে, সমালোচনা তাকে ক্লান্ত করেছে। কিন্তু তবুও, ব্রাজিল যখনই সংকটের সময়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তখনও যেন চোখ খোঁজে সেই ১০ নম্বর জার্সিকেই। কারন এই দলটার প্রতিভা আছে, গতি আছে, কৌশল আছে—কিন্তু এখনও “কেন্দ্র” নেই। নেইমার সেই কেন্দ্র হতে পারেন কি না, সেটাই এখন ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ক্রীড়াসলিল রাজনৈতিক ও আবেগীয় বিতর্ক।
সম্ভবত আনচেলোত্তিও জানেন—একজন অসম্পূর্ণ নেইমারও কখনও কখনও সম্পূর্ণ অন্য অনেকের থেকে বেশি বিপজ্জনক।

মিডফিল্ডে ব্রাজিলের গল্পটা আরও আকর্ষণীয়। ব্রুনো গিমারায়েস এখন এই দলের ছন্দ। তিনি বল নিয়ে দৌড়ান না, বরং খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তার পাশে ক্যাসেমিরো হতে পারেন শেষ যুদ্ধের অভিজ্ঞ সৈনিক—যার চোখে এখনও পরাজয়ের আগুন জ্বলছে। আর সেখানে নতুন প্রজন্মের সাহস নিয়ে হাজির আন্দ্রে সান্তোস কিংবা জোয়াও গোমস।
এই মিডফিল্ড আর আগের ব্রাজিলের মতো শুধু শিল্পীসুলভ নয়; যোদ্ধাও।
ডিফেন্স? সেখানেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় সংশয়।
মারকুইনোস বহু বছর ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন ক্লাব ফুটবলে, কিন্তু বিশ্বকাপ অন্যরকম চাপের নাম। আর তারপর আছে এক অদ্ভুত, নস্টালজিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা – থিয়াগো সিল্ভা।
৪১ বছর বয়সী এক ডিফেন্ডার। যার হাঁটু হয়তো আগের মতো না ও চলতে পারে, কিন্তু যার অভিজ্ঞতা এখনও পুরো ব্যাকলাইনের চেয়েও বড়।
কখনও কখনও বিশ্বকাপ কেবল তরুণদের টুর্নামেন্ট নয়। কখনও কখনও এটি অসমাপ্ত হিসাব মেটানোর জায়গাও। থিয়াগো সিলভার জন্য ২০২৬ হয়তো সেটাই। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার- এই ব্রাজিল দলটি এবার হয়তো ‘নাম’ দিয়ে নয়, ‘সিস্টেম’ দিয়ে খেলবে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিল নিজেদের রোমান্টিক ধারণায় বন্দি ছিল। তারা ভাবতো, প্রতিভা নিজেই পথ খুঁজে নেবে। কিন্তু আধুনিক ফুটবল নিষ্ঠুর। এখানে সৌন্দর্যের চেয়ে কাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আনচেলোত্তি সম্ভবত সেটাই বদলাতে চাইছেন। তিনি এমন এক ব্রাজিল গড়ছেন, যারা কাউন্টার-প্রেস করতে জানে, মিডফিল্ড কমপ্যাক্ট রাখতে জানে, এবং প্রয়োজনে কদর্য ফুটবল খেলেও ম্যাচ জিততে জানে।
এটাই হয়তো নতুন জোগা বনিতো- যেখানে সৌন্দর্য থাকবে, কিন্তু সরলতা থাকবে না।
গ্রুপ সি-তে মরোক্কো, স্কটল্যান্ড এবং হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল ফেভারিট হিসেবেই নামবে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস ব্রাজিলকে শিখিয়েছে-ফেভারিট হওয়া আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া এক জিনিস নয়।
তাহলে কি ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষ হবে?
উত্তরটা হয়তো কৌশলে নেই। হয়তো প্রতিভাতেও নেই। সম্ভবত উত্তরটা লুকিয়ে আছে ব্রাজিলের মানসিকতায়। কারন বহু বছর পর এবার তারা ‘অজেয়’ হওয়ার ভান করছে না। বরং তারা নিজেদের ভাঙ্গা-চোরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আবার নতুন করে দাঁড়াতে চাইছে।
আর ফুটবলে, পুনর্জন্মের গল্পগুলোই সবচেয়ে সুন্দর।