
সব ওষুধ একসাথে খাওয়া কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
অফিসে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করছেন সুমিত সাহেব। টেবিলে রাখা সকালের নাস্তা শেষ করেই সামনে থাকা প্রেসক্রিপশনের তিনটি ওষুধ—ডায়াবেটিস, প্রেশার আর একটা ভিটামিন ট্যাবলেট একসাথে মুখে পুরে এক ঢোকে পানি দিয়ে গিলে ফেললেন। ডাইনিং টেবিল থেকে জুতো পরে বের হতে হতে ভাবলেন, আলাদা করে একটা একটা করে ওষুধ খাওয়ার মতো সময় কার আছে! শুধু সুমিত সাহেবই নন, আমাদের চারপাশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এই একই চিত্র দেখা যায়।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড কিংবা সাধারণ গ্যাস্ট্রিক ও অ্যালার্জির দীর্ঘ ওষুধের তালিকা দেখে অনেকেই অলসতা করে কিংবা ঝামেলা এড়াতে হাতের কাছে থাকা সব ওষুধ একবারে এক ঢোকে গিলে ফেলেন। কিন্তু ঝটপট কাজ সারার এই চেনা বাস্তব অভ্যাসটি যে শরীরের জন্য কতটা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে, তা আমরা অনেকেই ভাবি না। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ঔষধবিজ্ঞান (Pharmacology) সংক্রান্ত গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ওষুধ এভাবে একসাথে খাওয়া মোটেও ঠিক নয় এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সব ওষুধ একসাথে খাওয়া মোটেও ঠিক নয় এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিষয়টিকে বলা হয় ‘ড্রাগ-ড্রাগ ইন্টারেকশন’। যখন ভিন্ন ভিন্ন কাজের একাধিক ওষুধ একসাথে পেটে যায়, তখন তারা একে অপরের ওপর রাসায়নিক প্রভাব ফেলে। এতে মূলত তিন ধরনের সমস্যা হতে পারে। প্রথমত, একটি ওষুধ অন্য ওষুধের কাজ করার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে, যার ফলে দামি ওষুধ খেয়েও রোগ সারবে না। দ্বিতীয়ত, একটি ওষুধ অন্যটির কার্যকারিতা ও শোষণ ক্ষমতা শরীরের ভেতর অতিরিক্ত বাড়িয়ে দিতে পারে, যা উল্টো বিষক্রিয়া তৈরি করে। আর তৃতীয়ত, দুটি ভিন্ন ওষুধের উপাদান পেটের ভেতর মিলেমিশে সম্পূর্ণ নতুন কোনো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা অ্যালার্জির জন্ম দিতে পারে।
বাস্তব ক্ষেত্রে এই ভুলের খেসারত হতে পারে বেশ চড়া। যদি কেউ গ্যাসের ওষুধ আর থাইরয়েডের ওষুধ একসাথে খেয়ে ফেলেন, তবে গ্যাসের ওষুধটি থাইরয়েডের ওষুধকে শরীরে শোষণ হতেই দেবে না। আবার ক্যালসিয়াম বা আয়রন ট্যাবলেটের সাথে কিছু নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক একসাথে খেলে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা প্রায় শূন্য হয়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে। হার্টের রোগীরা রক্ত পাতলা করার ওষুধের সাথে যদি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ব্যথানাশক ওষুধ একসাথে খেয়ে নেন, তবে শরীরে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া একসাথে একঝাঁক ওষুধ প্রসেস করতে গিয়ে আমাদের শরীরের দুটি প্রধান অঙ্গ লিভার এবং কিডনির ওপরও তীব্র চাপ পড়ে।
এই সমস্যা থেকে বাঁচার উপায় অবশ্য বেশ সহজ। প্রতিটি ওষুধের শরীরে কাজ করার নিজস্ব সময় ও আলাদা রাসায়নিক প্রক্রিয়া থাকে। তাই চিকিৎসকের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে দুটি ভিন্ন ওষুধ খাওয়ার মাঝে অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার ব্যবধান রাখা উচিত। বিশেষ করে এন্টাসিড, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ অন্য যেকোনো ওষুধের সাথে খাওয়ার ক্ষেত্রে এই সময়ের ব্যবধান রাখা জরুরি।

ওষুধ যেমন জীবনরক্ষাকারী, ভুল নিয়মে তা সেবন করা কিন্তু ততটাই আত্মঘাতী
তবে কোনো বিশেষ কারণে যদি চিকিৎসক বেশ কয়েকটি ওষুধ একসাথে খেতেই বলেন, তাহলেও একটি বড় ভুল এড়ানো জরুরি, আর তা হলো পানির ব্যাপারে কিপটেমি। এক মুঠো ওষুধের জন্য মাত্র এক ঢোক পানি কিন্তু যথেষ্ট নয়। যেহেতু প্রত্যেক ওষুধের একটি নির্দিষ্ট সারফেস এরিয়া থাকে, তাই যদি অনেকগুলো ওষুধ একসাথে খেতেই হয়, তবে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে যাতে সেগুলো শরীরের ভেতর ঠিকমতো প্রসেস হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো যখনই নতুন কোনো প্রেসক্রিপশন দেওয়া হবে, তখনই অলসতা না করে সরাসরি ডাক্তারের কাছ থেকে স্পষ্ট করে জেনে নেওয়া যে কোন ওষুধটির সাথে কোনটি একসাথে খাওয়া যাবে না এবং কোন দুটির মাঝে সময়ের গ্যাপ রাখতে হবে।
রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ যেমন জীবনরক্ষাকারী, ভুল নিয়মে তা সেবন করা কিন্তু ততটাই আত্মঘাতী। তাই সুস্থ ও নিরাপদ থাকতে অলসতা পরিহার করে সঠিক নিয়ম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে সবাইকে।
ভিজুয়াল স্টোরি