
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন ।। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর শেষ হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ১৯ ও ২০ মে অনুষ্ঠিত এই সফরকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা। বিশেষ করে মস্কো নিশ্চিত হতে চাইছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা যেন রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায়।
পুতিনের এই সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন রাশিয়া-চীন বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছে দুই দেশ। সফরে পুতিনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী, অর্থনৈতিক কর্মকর্তা এবং বড় বড় জ্বালানি কোম্পানির প্রতিনিধিরাও আছেন। এতে বোঝা যায়, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে মস্কো।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ অবশ্য দাবি করেছেন, ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে পুতিনের সফরের কোনো সম্পর্ক নেই। তার ভাষায়, এই সফরের প্রধান গুরুত্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সহযোগিতা।
অন্যদিকে চীন এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বকে দেখাতে চাইছে যে, একই সপ্তাহে বিশ্বের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির নেতাদের আতিথ্য দেওয়ার মতো কূটনৈতিক সক্ষমতা বেইজিংয়ের রয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, এই বৈঠক চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে এবং বিশ্বে স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক শক্তি যোগ করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই সফরের বড় একটি দিক হলো মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। বিশেষ করে ইরান সংকট, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে দুই দেশ উদ্বিগ্ন।
রাশিয়া ও চীন বিশ্বের বড় জ্বালানি শক্তি। ফলে তেল ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দুই দেশের সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সফরে ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-টু’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ইউরোপের বাজার হারানোর পর চীনে আরও বেশি গ্যাস ও তেল রপ্তানি করতে চায় মস্কো।
এছাড়া দুই দেশ মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে নিজেদের মুদ্রা ইউয়ান ও রুবলে বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করেছে। এতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ কমানোর চেষ্টা করছে তারা।
ইউক্রেন, তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুতে সমন্বয়
সফরে ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান সংকট এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনা হবে। তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের অবস্থানকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চায়।
চীন প্রকাশ্যে রাশিয়াকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তি দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও, পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ—বেইজিং রাশিয়াকে বেসামরিক ও সামরিক উভয় কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরবরাহ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর দেখিয়ে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মস্কো ও বেইজিং তাদের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। একই সঙ্গে চীন নিজেকে এমন একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে, যে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখছে।