
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ।। ছবি; আল জাজিরা
নরওয়ে সফরে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ায় আবারও সমালোচনার মুখে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক নরওয়েজিয়ান সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সংবাদ সম্মেলন কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সরকারের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নরওয়ের দৈনিক ডাগসাভিসেন-এর সাংবাদিক হেলে লিং সভেনসেন মোদিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেন না কেন?’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে মোদি সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তিনি প্রশ্নটি শুনেছিলেন কি না, তা অবশ্য নিশ্চিত নয়।
এরপর ওই সাংবাদিক মোদির পিছু নিয়ে আরও জানতে চান, ‘আপনি কি আমাদের সরকারের বিশ্বাস পাওয়ার যোগ্য?’ কিন্তু এবারও কোনো উত্তর দেননি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরের সঙ্গে বৈঠকের অংশ হিসেবে মোদি উত্তর ইউরোপ সফরে রয়েছেন। দুই দিনের নরওয়ে সফর শেষে তিনি ইতালিতে যান, যেখানে বুধবার প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা।
১২ বছরে একবারও সংবাদ সম্মেলন নয়
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভারতে একবারও উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলন করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিদেশ সফরেও খুব কম ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের প্রশ্ন নিয়েছেন। ২০২৩ সালে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রশ্ন নিয়েছিলেন, তবে সেটিও ছিল ব্যতিক্রম।
নরওয়ের ঘটনাটি সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো আবারও ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নেমেছে।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নে উত্তপ্ত পরিস্থিতি
একই দিনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জের সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্ন করেন সেই সাংবাদিক হেলে লিং সভেনসেন। তিনি জানতে চান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মধ্যে নরওয়ে কেন ভারতের ওপর আস্থা রাখবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং বৈষম্যমূলক আচরণ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। বিশেষ করে আন্তঃধর্মীয় বিয়ে, ধর্মান্তর এবং মুসলিম আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইন নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
তবে প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে সিবি জর্জ ভারতের অতীত ঐতিহ্য তুলে ধরতে শুরু করেন। তিনি বলেন, দাবা খেলার জন্ম ভারতে, ‘শূন্য’ ধারণার উৎপত্তিও ভারতেই। করোনাকালে ভারত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকা ও ওষুধ সরবরাহ করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
একপর্যায়ে সাংবাদিক তাকে থামিয়ে আবার মানবাধিকার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে দৃশ্যত ক্ষুব্ধ হয়ে জর্জ বলেন, ‘ভারত একটি সভ্যতাভিত্তিক দেশ।’
পরে তিনি ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ মানুষ ভারতে বাস করে, কিন্তু বিশ্বের সমস্যার ছয় ভাগের এক ভাগ আমাদের নয়। আমাদের সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে।’
‘প্রশ্ন করাই সাংবাদিকতার দায়িত্ব’
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সাংবাদিক হেলে লিং সভেনসেন। তিনি লেখেন, ‘সাংবাদিকতা অনেক সময় মুখোমুখি অবস্থানেরও বিষয়। আমরা উত্তর খুঁজি। ক্ষমতাবান কেউ প্রশ্নের উত্তর না দিলে আমি আবার প্রশ্ন করব—এটাই আমার দায়িত্ব।’
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম মোদি প্রশ্ন নেবেন না, কারণ তিনি সাধারণত নেন না। কিন্তু চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব। আমি এমন একটি দেশে সাংবাদিকতা করি, যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিরাপদ। আমি যদি প্রশ্ন করতে ভয় পাই, তাহলে কে করবে?’
তিনি আরও জানান, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে ব্যাপক ট্রল ও আক্রমণ শুরু হয়েছে। তবে অনেকেই তার প্রশ্নের প্রশংসাও করেছেন।
বিরোধীদের সমালোচনা
ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীও এ ঘটনায় মোদিকে কটাক্ষ করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘লুকানোর কিছু না থাকলে ভয় পাওয়ারও কিছু থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ব যখন দেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি প্রশ্নের মুখে আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে যান, তখন দেশের ভাবমূর্তি কী হয়?’
সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া
ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক রাজদীপ সারদেসাই বলেন, একসময় ভারতে সংবাদ সম্মেলনে কঠিন প্রশ্ন করা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, নরওয়ের একজন সাংবাদিকের সাধারণ প্রশ্নই বড় খবর হয়ে যাচ্ছে।
তবে সবাই যে নরওয়ের সাংবাদিকের আচরণকে সমর্থন করেছেন, তা নয়। কেউ কেউ বলেছেন, প্রশ্ন করার অধিকার থাকলেও উত্তরদাতাকে কীভাবে উত্তর দিতে হবে তা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
ভারতের সাংবাদিক স্বাতী চতুর্বেদী সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘কঠিন প্রশ্ন করা সাংবাদিকের অধিকার। কিন্তু উত্তর কীভাবে আসবে তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার নেই। মাঝপথে বেরিয়ে যাওয়া সাংবাদিকতা নয়, বরং রাগী অ্যাক্টিভিজম।’
ভারতে সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন?
২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৫৭তম। আগের বছরের তুলনায় আরও ছয় ধাপ নিচে নেমেছে দেশটি।
সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটির (সিপিজে) এশিয়া-প্যাসিফিক সমন্বয়ক কুনাল মজুমদার আল জাজিরাকে বলেন, ভারতে সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘চাপ শুধু সংবাদ প্রকাশে বাধা নয়। অনলাইন হয়রানি, আইনি মামলা, আয়কর ও তদন্ত সংস্থার চাপ—সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের জন্য কঠিন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, সরকার প্রায়ই সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আয়কর বিভাগ ও এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে (ইডি) ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ কঠোর আইনের প্রয়োগও বাড়ছে।
কুনাল মজুমদার আরও জানান, বর্তমানে ভারতে কারাবন্দি সাংবাদিকের সংখ্যা কমে দুইজনে দাঁড়ালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্লক, কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ এবং অস্পষ্ট সেন্সরশিপ নীতির মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বেড়েছে।
সম্প্রতি আল জাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভেদও ভারতের একটি রাজ্য পুলিশের নির্দেশে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ পেয়েছেন।
তার মতে, ‘এমন পরিস্থিতিতে মানবাধিকার বা সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকদের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।’
আল জাজিরা অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল