
প্রতিষ্ঠানটির আয় দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশের সমান
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস বড় ধরনের শ্রমিক সংকটের মুখে পড়েছে। বোনাস কাঠামো নিয়ে বিরোধের জেরে কোম্পানিটির প্রায় ৪৮ হাজার কর্মী ১৮ দিনের ধর্মঘটে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এ কর্মসূচি দেশটির অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের শ্রমিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, বর্তমান বোনাস ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করেই তারা এই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে স্যামসাং কর্মীদের বার্ষিক বোনাসের সীমা নির্ধারিত রয়েছে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে ইউনিয়নের দাবি, এই সীমা তুলে দিয়ে কোম্পানির বার্ষিক পরিচালন মুনাফার ১৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে দিতে হবে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন বলছে—স্যামসাংয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সসহ আরও কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানি তাদের কর্মীদের তুলনামূলক বেশি বোনাস দিচ্ছে।
তবে স্যামসাং কর্তৃপক্ষ ইউনিয়নের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, ইউনিয়নের কিছু দাবি ‘অগ্রহণযোগ্য’, বিশেষ করে লোকসানে থাকা ইউনিটগুলোর ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ইউনিয়ন।
বুধবার সরকারি মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি।
ইউনিয়ন নেতা চোই সিউং-হো জানিয়েছেন, সরকারি মধ্যস্থতাকারীর দেওয়া একটি চূড়ান্ত প্রস্তাবে তারা রাজি হয়েছিলেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পক্ষ অনড় থাকায় ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যতটা সম্ভব ছাড় দিয়েও আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি, এজন্য জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে ধর্মঘট চললেও আলোচনার চেষ্টা বন্ধ হবে না।’
ধর্মঘটে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া কর্মীদের বেশিরভাগই স্যামসাংয়ের চিপ বিভাগে কাজ করেন। মোট কর্মীর প্রায় ৩৮ শতাংশ এই কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারেন।
স্যামসাং বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এসব চিপ কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডেটা সেন্টারসহ নানা ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ধর্মঘট হলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতেও স্যামসাংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত বড়। প্রতিষ্ঠানটির আয় দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশের সমান।
দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘ব্যাংক অব কোরিয়া’ সতর্ক করে জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘট হলে চলতি বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এক প্রতিবেদনে ব্যাংকটি বলেছে, ধর্মঘটের কারণে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ওন বা ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে মেমোরি চিপ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওকও সতর্ক করে বলেছেন, ধর্মঘট বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ‘কল্পনাতীত ক্ষতির’ মুখে পড়বে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, স্যামসাংয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আদালত বলেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ইউনিটে ন্যূনতম কর্মী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়নকে কোম্পানির স্থাপনা দখল বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।