
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কারণ গত এক সপ্তাহে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী নেতা—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেইজিংয়ে তার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে চীন বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে যে বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতায় বেইজিংকে এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই।
পুতিনকে স্বাগত জানানোর আয়োজন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। শিশুদের অভ্যর্থনা, সামরিক গার্ড অব অনার, কামান নিক্ষেপ এবং ব্যান্ড দলের পরিবেশনা—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি ছিল অনেকটা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সফরের মতোই। এই দুই সফরের মাধ্যমে শি জিনপিং এমন একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন যে চীন এখন সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে এবং কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে সরে যাচ্ছে এবং সেই পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠছে চীন। আর চীন সরাসরি সংঘাত মেটানোর চেয়ে ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।
রাশিয়ার জন্য চীন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো আগের চেয়ে অনেক বেশি বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে চীনই রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তেল-গ্যাসের বড় ক্রেতা।
শি-পুতিন বৈঠকে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে ২০টির বেশি চুক্তি হলেও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। এতে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই সম্পর্কে চীনের অবস্থান এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও আলোচনায় শি জিনপিং আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে ছিলেন। বৈশ্বিক বাণিজ্যে চীনের শক্ত অবস্থান, বিরল খনিজ সম্পদ এবং উন্নত উৎপাদন খাত বেইজিংকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রায় সমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও পুতিন—দুজনই দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের চাপে রয়েছেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট তার জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে, আর পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
মাত্র পাঁচ বছর আগেও চীন অনেকটা কূটনৈতিক চাপে ছিল। কোভিড মহামারির সময় ট্রাম্প ভাইরাসটিকে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। একই সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও খারাপ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘উলফ ওয়ারিয়র’ কূটনীতি, শিনজিয়াংয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং হংকংয়ে বেইজিংয়ের কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছিল।
তবে এখন পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। চীন তার কূটনৈতিক ভাষা কিছুটা নরম করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে আবারও সম্পর্ক জোরদার করছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং সফর করেছেন। সাম্প্রতিক এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো দেশটির অভ্যন্তরেও শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে—যেখানে শিকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যার সঙ্গে সবাই সম্পর্ক রাখতে চায়।
তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্যেও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
চীন ও রাশিয়া যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ ও অন্য দেশের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রচেষ্টার সমালোচনা করলেও ইউক্রেন প্রসঙ্গে নীরবতা ইউরোপের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে চীন প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলেও বাস্তবে তারা রাশিয়াকে পুরোপুরি হারতে দেখতে চায় না। কারণ মস্কো বেইজিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র।
অন্যদিকে, ইরান সংকট চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তেলের সরবরাহে ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই এই সংঘাত দ্রুত শেষ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বেইজিং।
তবে এক যুদ্ধ নিয়ে সরব হওয়া এবং অন্য যুদ্ধ নিয়ে নীরব থাকা চীনের নিরপেক্ষতার দাবি ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।