
ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির বিয়ে ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আয়োজনগুলোর একটি
শৈশব থেকেই ভারতের মুম্বাইয়ের বাসিন্দা শুভাঙ্গী শেঠের স্বপ্ন ছিল ইতালির মনোরম লেক কোমোতে বিয়ে করার। পাহাড়ঘেরা নীল জলরাশি আর বিলাসবহুল পরিবেশের জন্য জায়গাটি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। জর্জ ও আমাল ক্লুনি কিংবা জন লেজেন্ড ও ক্রিসি টেইগেনের মতো তারকারাও সেখানে বিয়ে করেছেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুভাঙ্গীর সেই স্বপ্ন বদলে যায়। বিদেশের চাকচিক্যের বদলে তিনি গুরুত্ব দেন নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে।
২৯ বছর বয়সী শুভাঙ্গী সিএনএনকে বলেন, “আমি খুব ঐতিহ্যবাহী, নিজের শিকড়ের সঙ্গে জড়ানো একটি বিয়ে চাই। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিয়েটা ভারতেই করব।”
এমন সিদ্ধান্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য সুখবরই বলা যায়। কারণ তিনি আবারও দেশবাসীকে বিদেশে গিয়ে বিয়ে না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বিদেশে বিলাসবহুল বিয়ে করলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে যায়।
সম্প্রতি এক সমাবেশে মোদি বলেন, “বিদেশে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। বিয়ের জন্য আমাদের নিজের ভারতের চেয়ে সুন্দর বা পবিত্র জায়গা আর হতে পারে না।”
কেন বাড়ছে এই উদ্বেগ?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের পর ভারতের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। ভারত তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে, যার বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়ছে এবং ভারতের মুদ্রা রুপির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রুপির মান ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। বর্তমানে এটি এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল পারফরম করা প্রধান মুদ্রাগুলোর একটি। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে জ্বালানি সাশ্রয়, বাড়ি থেকে কাজ করা, দেশীয় পর্যটন বেছে নেওয়া এবং এমনকি এক বছরের জন্য স্বর্ণ কেনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারতে স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, বরং সৌভাগ্য ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। অথচ এই স্বর্ণের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
ভারতের বিশাল বিয়ের বাজার
গত এক দশকে ভারতের বিয়ের আয়োজন অনেক বদলে গেছে। বলিউডের জাঁকজমক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং তারকাদের বিলাসী বিয়ের কারণে এখন বিয়ে মানেই বিশাল আয়োজন।
বর্তমানে ভারতে বিয়ের বাজারের আকার প্রায় ১৩০ বিলিয়ন ডলার বলে জানিয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেফারিজ। খাদ্য ও মুদি খাতের পর এটিই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোক্তা খাত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিয়ের বাজারের প্রায় দ্বিগুণ।
ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন বিয়ে হয়।
ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানির বিয়ে ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত আয়োজনগুলোর একটি। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিম কারদাশিয়ান, মার্ক জাকারবার্গ, বিল গেটস, রিহানা এবং নরেন্দ্র মোদি নিজেও।
অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও গায়ক নিক জোনাসের জোধপুরের ঐতিহাসিক উমেদ ভবন প্যালেসে বিয়েও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় ছিল।
এখন অনেকেই বিদেশের বদলে ভারতের মধ্যেই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে করতে আগ্রহী হচ্ছেন। বিয়ের ইভেন্ট করেন এমন একজন বিক্রমজিৎ শর্মা। তিনি জানান, গত বছর তারা ২৮টি বিয়ের আয়োজন করেছেন, যার মধ্যে মাত্র তিনটি হয়েছিল বিদেশে।
তার ভাষায়, ‘ভারতে বিয়ের সংখ্যা, আয়োজনের আকার এবং গড় খরচ—সবই অনেক বেড়েছে।’
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ থেকে ‘ওয়েড ইন ইন্ডিয়া’
নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরেই আত্মনির্ভরতা ও দেশীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। ২০১৪ সালে তিনি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি চালু করেন, যার লক্ষ্য ছিল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো।
এক দশক পর তিনি একই বার্তাকে বিয়ের বাজারেও প্রয়োগ করেছেন—নতুন স্লোগান, ‘ওয়েড ইন ইন্ডিয়া’। তবে বিরোধীরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে ত্যাগ স্বীকারের আহ্বান জানালেই দেশের গভীর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, `মোদি জনগণকে বলছেন—স্বর্ণ কিনবেন না, বিদেশে যাবেন না, কম তেল ব্যবহার করুন, বাসা থেকে কাজ করুন। এগুলো উপদেশ নয়, বরং ব্যর্থতার প্রমাণ।’
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল