
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্কগুলোর একটি হলো চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব
চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে অনেকদিন ধরেই বলা হয় ‘আয়রন ব্রাদার্স’ বা লৌহবন্ধুত্ব। পাহাড়ের চেয়েও উঁচু, সমুদ্রের চেয়েও গভীর— দুই দেশের নেতারা প্রায়ই এভাবেই তাদের সম্পর্কের বর্ণনা দেন। কিন্তু এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, গোপন চুক্তি, পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ভারতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের কৌশলগত হিসাব।
চীন ও পাকিস্তান এ বছর তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। এই উপলক্ষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আগামী ২৩ মে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাচ্ছেন। সফরে তার সঙ্গে থাকবেন দেশটির শীর্ষ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্কগুলোর একটি হলো চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব।
কাশ্মীরের জমি দিয়েই শুরু হয়েছিল আস্থার সম্পর্ক
১৯৬৩ সালে পাকিস্তান বিরল এক সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটি কারাকোরাম অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার শাকসগাম উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত এই এলাকাকে জম্মু কাশ্মীরের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।
এই ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তান তখন মনে করেছিল, বিতর্কিত পাহাড়ি অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেয়ে চীনের হাতে তুলে দেওয়া কৌশলগতভাবে বেশি লাভজনক। বিশ্লেষকদের মতে, সেখান থেকেই দুই দেশের মধ্যে গভীর আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।
আদর্শে ভিন্ন, স্বার্থে এক
একদিকে কমিউনিস্ট ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নাস্তিক চীন, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান— আদর্শগতভাবে দুই দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবুও ভারতবিরোধী অভিন্ন কৌশল তাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
১৯৫০ সালে পাকিস্তান বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে গণচীনকে স্বীকৃতি দেয়। তখনও অনেক পশ্চিমা দেশ বেইজিংকে স্বীকৃতি দেয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল কৌশলগত সিদ্ধান্ত। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের মোকাবিলায় শক্তিশালী মিত্র খুঁজছিল ইসলামাবাদ।
গোপন পারমাণবিক সহযোগিতা
চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকৃত অধ্যায় হলো পারমাণবিক সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর পাকিস্তানও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা শুরু হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, চীন পাকিস্তানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি, নকশা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহে সহায়তা করেছিল। যদিও দুই দেশই কখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, ‘পাকিস্তান যেখানে আটকে গেছে, চীন সেখানেই সহযোগিতা করেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও বড় ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের
১৯৭১ সালে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফরের ব্যবস্থা করেছিল পাকিস্তান। সেই সফরই পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পথ খুলে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পেছনে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন স্বীকৃতি পায়নি ইসলামাবাদ।
সিপিইসি: বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় প্রকল্প
২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পাকিস্তানে গিয়ে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)’ প্রকল্প ঘোষণা করেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলকে পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন ও বন্দর উন্নয়নসহ বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সিপিইসি পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়ন করলেও ঋণের চাপ বাড়িয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশই চীনের কাছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ রয়েছে চীনের কাছে।
সামরিক নির্ভরতা আরও বেড়েছে
বর্তমানে পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র আসে চীন থেকে। দেশ দুটি যৌথভাবে তৈরি করছে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। এছাড়া ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এখন পুরোপুরি চীনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান।
সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় চীনা অস্ত্র ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। বিশ্লেষকদের মতে, চীন পাকিস্তানকে শুধু কৌশলগত মিত্র নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য হিসেবে দেখে।
নতুন বাস্তবতা, কিন্তু সম্পর্ক এখনো অটুট
তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনও বদলেছে। পাকিস্তানে চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা, সিপিইসি প্রকল্পে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হওয়ায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তারপরও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক এখন এতটাই গভীরে পৌঁছেছে যে সহজে তা ভাঙার সুযোগ নেই।
কারণ চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের মূল শক্তি আবেগ নয়, বরং পারস্পরিক কৌশলগত প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, গত ৭৫ বছরে সরকার বদলেছে, বিশ্ব রাজনীতি বদলেছে, কিন্তু চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক টিকে আছে— কারণ দুই দেশই একে অপরকে এখনো প্রয়োজনীয় মনে করে।