
এই ক্ষোভ ও হাস্যরস থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’—যার নামটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) নামেরই ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ
ভারতের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত প্রতীক—তেলাপোকা। ব্যঙ্গ, মিম আর অনলাইন ক্ষোভ মিলিয়ে তৈরি হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে।
ঘটনার শুরু ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে। এক শুনানিতে তিনি বেকার তরুণদের, যারা সাংবাদিকতা বা অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকছে, তাদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে তিনি মূলত ‘ভুয়া ডিগ্রিধারী’দের কথা বলেছেন, ভারতের সব তরুণদের নয়। কিন্তু ততক্ষণে মন্তব্যটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
এই ক্ষোভ ও হাস্যরস থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’—যার নামটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) নামেরই ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ।
মজা থেকে আন্দোলন
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আসলে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়। এটি একটি অনলাইন ব্যঙ্গধর্মী আন্দোলন। তাদের সদস্য হওয়ার শর্তও বেশ হাস্যকর—‘বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারভাবে অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে!’
এই উদ্যোগের পেছনে আছেন অভিজিৎ দিপকে নামে ৩০ বছর বয়সী এক ভারতীয় তরুণ, যিনি বর্তমানে বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আগে তিনি ভারতের আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সবাই মিলে একটা প্ল্যাটফর্ম বানানো যায়। কিন্তু ব্যাপারটা এত বড় হয়ে যাবে ভাবিনি।’
কয়েক দিনের মধ্যেই ভাইরাল
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সিজেপি লাখো মানুষের দৃষ্টি কাড়ে। গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ সদস্য হওয়ার আবেদন করে। #MainBhiCockroach (আমিও তেলাপোকা) হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড হতে থাকে।
ভারতের বিরোধী নেতারাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এক্সে (টুইটার) লেখেন: ‘বিজেপি বনাম সিজেপি’।
এমনকি কিছু তরুণ তেলাপোকার পোশাক পরে প্রতিবাদ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো—সিজেপি-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মাত্র এক সপ্তাহেই ১ কোটির বেশি ফলোয়ার পেয়ে যায়, যা বিজেপি’র অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।
তবে তাদের এক্স অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ভারতে দেখা যাচ্ছে না। সেখানে বার্তা দেখাচ্ছে যে ‘আইনি অনুরোধের ভিত্তিতে’ অ্যাকাউন্টটি বন্ধ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারই একাউন্টটি ভারতের বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করেছে।
কেন এত জনপ্রিয় হলো?
অনেক তরুণের কাছে সিজেপি যেন হতাশা প্রকাশের নতুন ভাষা। ভারতের বিপুল যুবসমাজের বড় অংশ মনে করে, রাজনীতিতে তাদের কণ্ঠস্বর নেই।
ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ২৯% তরুণ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে থাকে, আর মাত্র ১১% কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য।
অর্থনীতি দ্রুত বাড়লেও চাকরির অনিশ্চয়তা, বৈষম্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক তরুণ হতাশ। শিক্ষিত হয়েও অনেকেই স্থায়ী ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না।
অভিজিৎ দিপকের ভাষায়, ‘জেন জি প্রজন্ম প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে। তারা নিজেদের ভাষায় নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায়।’
মিমের আড়ালে বাস্তব ক্ষোভ
সিজেপি’র ওয়েবসাইটে নিজেদের পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে। সেখানে মজা, আত্মবিদ্রূপ আর রাজনৈতিক বার্তা একসঙ্গে মিশে আছে।
হাস্যরসের আড়ালে তারা মিডিয়া সংস্কার, জবাবদিহিতা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর মতো বিষয়ও তুলে ধরছে। তাদের প্রতীক হিসেবে তেলাপোকা বেছে নেওয়ার কারণও অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তেলাপোকা খুব আকর্ষণীয় কিছু নয়, কিন্তু এটি টিকে থাকতে জানে—কঠিন পরিস্থিতিতেও সহজে হার মানে না।
রাজনীতিতে নতুন ধারা?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন আন্দোলন দেখা গেছে। ইতালিতে কৌতুক অভিনেতা বেপ্পে গ্রিলো ‘ফাইভ স্টার মুভমেন্ট’ গড়েছিলেন। ইউক্রেনে টিভির কাল্পনিক প্রেসিডেন্ট চরিত্রে অভিনয় করা ভলোদিমির জেলেনস্কি পরে বাস্তব প্রেসিডেন্ট হন।
ভারতে সিজেপি এখনো মূলধারার রাজনৈতিক শক্তি নয়। বিজেপি ও কংগ্রেস এখনও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল। তবে সিজেপি দেখিয়ে দিয়েছে, তরুণদের হতাশা এখন শুধু রাস্তায় নয়, মিম ও অনলাইন সংস্কৃতির মাধ্যমেও প্রকাশ পাচ্ছে।
কেউ বলছেন, এটি সাময়িক সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড। আবার অনেকে মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের নতুন ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা।
যাই হোক, সিজেপি অন্তত একটি কাজ করেছে—অনেক তরুণকে সাময়িকভাবে হলেও মনে করিয়েছে যে তাদের কথাও কেউ শুনছে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প