
পেপ গার্দিওলা
ফুটবল কোচ হিসেবেই শুধু নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্যও পরিচিত পেপ গার্দিওলা। এই তারকা স্প্যানিশ কোচ বহুবার প্রমাণ করেছেন, ফুটবল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও মাঠের বাইরের কিছু বিষয়ও তার কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে।
রোববার ম্যানচেস্টার সিটির ডাগআউটে শেষবারের মতো দাঁড়াতে যাচ্ছেন ৫৫ বছর বয়সী গার্দিওলা। গত এক দশকে ক্লাবটির হয়ে ২০টি শিরোপা জয় করেছেন তিনি। তবে এই সময়ে শুধু সাফল্যের জন্য নয়, ফিলিস্তিনি শিশুদের দুর্দশা, কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন এবং যুক্তরাজ্যের গৃহহীন মানুষের সমস্যা নিয়ে সরব হওয়ার কারণেও আলোচনায় ছিলেন তিনি।
গার্দিওলা বরাবরই বিশ্বাস করেন, সমাজকে আরও ভালো করার জন্য নিজের পরিচিতি ও প্রভাবকে কাজে লাগানো উচিত। তাই ফুটবলের বাইরের নানা ইস্যুতেও তিনি প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা করেননি।
গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের পক্ষে সরব
সাম্প্রতিক সময়ে গার্দিওলার সবচেয়ে আলোচিত অবস্থান ছিল গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের মানবিক সংকট নিয়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি হামলায় হাজারো শিশু নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও অনেক পরিবার এখনো তাবুতে বসবাস করছে এবং মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক।
এ বছরের জানুয়ারিতে বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত ‘অ্যাক্ট এক্স প্যালেস্টাইন’ নামের একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনও এড়িয়ে যান গার্দিওলা। গলায় ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ জড়িয়ে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মাকে খুঁজতে থাকা শিশুদের দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তার ভাষায়, এসব শিশু যেন বিশ্বের কাছে পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে।
প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে গার্দিওলার অবস্থান ব্যাপক প্রশংসা পেলেও সমালোচনারও মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, তার কিছু মন্তব্য শহরের ইহুদিদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
তবে সমালোচনার মুখেও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি গার্দিওলা।
কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নেও সক্রিয়
নিজের জন্মভূমি কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষেও বহুবার সরব হয়েছেন গার্দিওলা। ২০১৮ সালে কারাবন্দি কাতালান রাজনীতিকদের প্রতি সংহতি জানিয়ে হলুদ ফিতা পরার কারণে তাকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও তার অবস্থান বদলায়নি।
ইউক্রেন, সুদান ও যুক্তরাষ্ট্র নিয়েও বক্তব্য
শুধু ফিলিস্তিন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও মানবিক সংকট নিয়েও কথা বলেছেন গার্দিওলা। ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন ও সুদানের সহিংসতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের অভিযানে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গার্দিওলার মতে, কোনো মতাদর্শ বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সবসময়ই কথা বলে যাবেন।
গৃহহীন মানুষের পাশেও গার্দিওলা
মানবিক বিষয়গুলোর মধ্যে গৃহহীন মানুষের সমস্যাও দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এই স্প্যানিশ কোচ। তার প্রতিষ্ঠিত গার্দওলা সালা ফাউন্ডেশন ম্যানচেস্টারে দ্য স্যালভেশন আর্মি পরিচালিত ‘পার্টনারশিপ ট্রফি’ নামের পাঁচজনের ফুটবল টুর্নামেন্টকে সহায়তা করে আসছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য যুক্তরাজ্যে গৃহহীনতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
গার্দিওলার মতে, ফুটবল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষকে একত্রিত করতে পারে এবং কঠিন ব্যক্তিগত সংকট কাটিয়ে উঠতেও সহায়তা করতে পারে।
ফুটবলের বাইরেও এক প্রভাবশালী কণ্ঠ
ম্যানচেস্টার সিটির ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে গার্দিওলার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে তার পরিচয় শুধু ট্রফি জয়ী কোচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিলিস্তিন, কাতালোনিয়া, ইউক্রেন, সুদান কিংবা গৃহহীন মানুষের মতো বিভিন্ন মানবিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে তিনি নিজেকে ফুটবলের বাইরেও এক প্রভাবশালী সামাজিক কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।