রবিবার । মে ২৪, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ২৪ মে ২০২৬, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

বিদ্রোহী কবির ভেতরের রকস্টার

নজরুলের গানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিস্ময়কর মেলবন্ধন


Kobi Nazrul

বাংলা টেলিগ্রাফ গ্রাফিক্স

বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামকে সাধারণত বিদ্রোহী কবি, গণসংগীতের স্রষ্টা কিংবা ইসলামী গানের পথিকৃৎ হিসেবেই বেশি আলোচনা করা হয়। কিন্তু তাঁর আরেকটি পরিচয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। তিনি ছিলেন বাংলা সংগীতের সবচেয়ে সাহসী ‘সাউন্ড এক্সপেরিমেন্টার’দের একজন। এমন এক শিল্পী, যিনি একইসঙ্গে রাগসংগীত, আরবি-ফারসি সুর, লোকসংগীত, মার্চিং রিদম, জ্যাজ, এমনকি আধুনিক রকধর্মী শক্তিকেও নিজের গানের ভেতর টেনে এনেছিলেন। আজকের ভাষায় বললে, নজরুল ছিলেন এক ধরনের ‘জঁর-ভাঙা’ সংগীতকার। তিনি কোনো এক ধারার ভেতর বন্দি থাকেননি।

একদিকে ‘আলগা করো গো খোপার বাঁধন’, ‘পরদেশী মেঘ যাও রে ফিরে’, ‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল’— এসব গানে তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের কোমলতা, মাধুর্য ও রাগভিত্তিক আবহ তৈরি করেছেন। অন্যদিকে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’— এসব গানে আছে এমন এক গতি, শক্তি আর ছন্দ, যাকে আজকের শ্রোতারা সহজেই আজকের রকের পূর্বসূরি বলে কল্পনা করতে পারেন।

নজরুলের গান শুনলে বোঝা যায়, তিনি শুধু সুর করতেন না; তিনি শব্দকে চালাতেন শক্তি দিয়ে।

‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম’ শুনলে মনে হয় যেন কোনো ব্যান্ডের পারকাশনভিত্তিক পারফরম্যান্স চলছে। ঢোলের গভীর ধাক্কা, তালের টানটান চাপ, আর কণ্ঠের সম্মিলিত বিস্ফোরণ— সব মিলিয়ে একটি প্রলয়ধর্মী এনার্জি তৈরি হয়। গানের শব্দগুলোও যেন নিজেই ছন্দ তৈরি করে। ‘উদ্দাম’, ‘ঝঞ্ঝা’, ‘ছিন্ন’, ‘প্রলয়’— এসব শব্দ কেবল অর্থ বহন করে না, এগুলো শব্দের ভেতরেই রিদম তৈরি করে।

একই বিষয় ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’তেও দেখা যায়। গানটি শুধু দেশাত্মবোধক নয়, এর ভেতরে এক ধরনের মার্চিং এনার্জি আছে। যেন পায়ের নিচে ধুলা উড়ে যাচ্ছে, সামনে দীর্ঘ পথ, আর একটি সমবেত কণ্ঠ এগিয়ে চলেছে একসঙ্গে। ড্রামবিটের মতো পুনরাবৃত্তি, দ্রুত অগ্রসর হওয়া লাইন, আর সমষ্টিগত কণ্ঠের আহ্বান— সব মিলিয়ে এটি অনেক বেশি ‘পারফরমেটিভ’, অনেক বেশি শারীরিক।

মজার বিষয় হলো, এসব গান তৈরি হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ‘রক মিউজিক’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক ধারা তখনও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সংগীতের যে বুনো শক্তি, বিদ্রোহী গতি আর আবেগীয় বিস্ফোরণ পরে রকে দেখা যায়, তার কিছু উপাদান নজরুল অনেক আগেই ব্যবহার করেছিলেন।

আবার একই মানুষ যখন ‘নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখিজল’ লেখেন, তখন তিনি একেবারে অন্য মানুষ। সেখানে কণ্ঠ নরম হয়ে আসে। সুর ধীরে নামে, যেন ভেজা আলোয় কোনো ঘর নিঃশব্দে ভরে যাচ্ছে। ‘পরদেশী মেঘ যাও রে ফিরে’ গানে আছে রাগভিত্তিক বিষণ্নতা, এক ধরনের দূরের ডাক। ‘আলগা করো গো খোপার বাঁধন’ গানে আছে ঠুমরির কোমল আবেদন, যেখানে প্রেম একেবারে ব্যক্তিগত, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলা। এই বৈপরীত্যই নজরুলকে আলাদা করে।

তিনি শুধু ধারাগুলো ব্যবহার করেননি, তিনি সেগুলোকে মিশিয়েছেনও। তাঁর গানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন কখনও খুব সূক্ষ্ম, কখনও খুব প্রকাশ্য।

‘বিদেশিনী চিনি চিনি’ গানটি শুনলেই বিষয়টি বোঝা যায়। এর ভেতরে এক ধরনের জ্যাজধর্মী দোল আছে। গানের ভঙ্গি, তাল, উচ্চারণ— সবকিছুতেই এক ধরনের শহুরে আধুনিকতা কাজ করে। যেন কলকাতার কোনো পুরোনো থিয়েটার হলের ভেতর হঠাৎ আলো বদলে যাচ্ছে, আবার পাশেই গ্রামোফোনে অন্য কোনো সুর ঘুরছে। এটি নিছক বাংলা প্রেমের গান নয়; এর মধ্যে ১৯৩০-এর দশকের বৈশ্বিক সংগীত-পরিবেশের ছায়া পাওয়া যায়।

আবার ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ গানে যে সুরের দোলা পাওয়া যায়, সেটিও অনেকের কাছে জ্যাজ বা লাতিন রিদমের স্মৃতি তৈরি করে। তাল যেন একটু দুলে দুলে হাঁটে, আবার হঠাৎ থেমে যায়, আবার এগোয়। বাংলা গানের ভেতরে তখনই এক ধরনের বৈশ্বিকতা ঢুকে পড়ছে, যা সময়ের অনেক আগে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিল্পী-চেতনার ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে ‘মোমের পুতুল মমির দেশে’ কিংবা ‘মরুর সুরে খেজুর পাতার নুপুর’ শুনলে মনে হয় বাংলা গান হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মরু শহরে পৌঁছে গেছে। বাতাসে ধুলো উড়ে, দূরে উটের ঘণ্টা বাজে, আর কণ্ঠে আরবি-ফারসি উচ্চারণের ছায়া মিশে যায়। সুরের ভেতর যেন বালুর ঢেউ, আর সেই ঢেউয়ের উপর ভেসে যাচ্ছে বাংলা শব্দ।

এই জায়গাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নজরুল পশ্চিমা সুর ব্যবহার করেছেন, কিন্তু নিজের শিকড় হারাননি। আবার প্রাচ্যের সুরও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সেটিকে জাদুঘরে আটকে রাখেননি। তিনি সুরকে চলমান রেখেছেন। তাঁর সময়ের বাংলা সংগীতের বড় অংশই ছিল হয় কীর্তননির্ভর, নয়তো রবীন্দ্রীয় আবহের ভেতর সীমাবদ্ধ। নজরুল সেখানে হঠাৎ করেই এক বহির্মুখী জানালা খুলে দেন। তাঁর গানে সৈনিকের পদচারণা আছে, মরুভূমির বাতাস আছে, ক্যাবারের আলো আছে, দরবারি রাগ আছে, লোকজ দোলা আছে।

এক অর্থে তিনি ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম ‘কসমোপলিটান’ সংগীত নির্মাতাদের একজন।

তাঁর ব্যক্তিজীবনের দিকেও তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। ব্রিটিশ ভারত তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। কলকাতা ছিল সাম্রাজ্য, থিয়েটার, সামরিক সংস্কৃতি, রেডিও, গ্রামোফোন ও নগরজীবনের মিলনস্থল। নজরুল সৈনিক ছিলেন, থিয়েটারে কাজ করেছেন, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন। ফলে তাঁর সংগীতও হয়ে উঠেছিল চলমান পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এত বৈচিত্র্যের পরও তাঁর গান কৃত্রিম লাগে না।

অনেক শিল্পী ভিন্ন ধারার সুর ব্যবহার করতে গিয়ে আলাদা আলাদা অংশ জোড়া লাগানোর মতো অনুভূতি তৈরি করেন। নজরুলের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ তিনি ধারাগুলো ‘ধার’ নেননি; তিনি সেগুলো আত্মস্থ করেছিলেন। তাই ‘বিদেশিনী চিনি চিনি’ যেমন স্বাভাবিক লাগে, তেমনি ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে’ও স্বাভাবিক লাগে। ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম’ যেমন গীতিময়, ‘চল চল চল’ তেমনি অগ্নিময়।

আজকের দিনে ফিউশন মিউজিক খুব পরিচিত শব্দ। ব্যান্ড সংগীত, লোক-রক, বাংলা জ্যাজ— এসব নিয়ে অনেক পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু প্রায় একশ বছর আগে নজরুল একাই সেই পথের অনেকটা হেঁটে গিয়েছিলেন।

সম্ভবত এ কারণেই তাঁর গান এত ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের কাছে নতুন মনে হয়। কেউ তাঁর গানে রাগসংগীত খুঁজে পান, কেউ বিপ্লবের ড্রামবিট, কেউ জ্যাজের ছায়া, কেউ মধ্যপ্রাচ্যের সুরভঙ্গি। একজন শিল্পীর ভেতরে এতগুলো সাউন্ডস্কেপ একসঙ্গে খুব কমই দেখা যায়।

নজরুলকে তাই শুধু বিদ্রোহের কবি বললে তাঁর সংগীতের বিশালতাকে ছোট করে দেখা হয়। তিনি ছিলেন বাংলা গানের এক দুর্দান্ত সেতুবন্ধনকারী— যিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, শাস্ত্রীয়তা ও উন্মাদনা, কোমলতা ও বিস্ফোরণকে একই সুরের জগতে জায়গা করে দিয়েছিলেন।

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল