
স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি হবে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে তারা একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
উভয় পক্ষ একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে আলোচনা করছে, যেখানে বাকি সব বিরোধপূর্ণ বিষয় সমাধানের একটি রূপরেখা থাকবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই স্মারকে ঠিক কী থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মূল ধারণা হলো, স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি হবে। এটি উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এ বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচন মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে রয়েছে।
সাম্প্রতিক খসড়া অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলে ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও তুলে নেওয়া হবে। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বাকি জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, স্মারকের এক বা দুটি ধারা নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে। ফলে এটি আদৌ চূড়ান্ত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন যে চুক্তির বেশিরভাগ অংশ নিয়ে সমঝোতা হয়ে গেছে, কিন্তু পরে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র কোনো তাড়াহুড়ো করে চুক্তি করবে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে মতবিরোধ
শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, নতুন সমঝোতার আওতায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
কিন্তু ইরানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম, যাদের মধ্যে কিছু ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ, জানিয়েছে যে প্রণালিটি ইরানের তত্ত্বাবধানেই থাকবে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের মতো স্বাভাবিক করা হবে।
ইরান একই সঙ্গে দাবি করছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধও তুলে নিতে হবে। তবে ট্রাম্প রবিবার বলেছেন, ‘চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বহাল থাকবে।’
ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, প্রণালি খুলে দেওয়া মানে এই নয় যে তারা এর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বা দাবির অবস্থান থেকে সরে আসছে। যুদ্ধের সময় ইরান দাবি করেছিল, এই পথ দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে তারা ফি আদায়ের অধিকার রাখে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নয়। এটি আমাদের এবং উপকূলীয় দেশগুলোর বিষয়, বিশেষ করে ওমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।’
ইউরেনিয়াম মজুত ও পারমাণবিক কর্মসূচি
সম্ভাব্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না—এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এছাড়া উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করা এবং নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ইরান বলছে, যুদ্ধ সমাপ্তির স্মারক চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ‘এই চুক্তিতে ইরান পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তর, যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলা, স্থাপনা বন্ধ করা কিংবা পারমাণবিক বোমা না বানানোর কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।’
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের কাছে থাকা ৪০০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো না কোনোভাবে সরিয়ে ফেলতেই হবে। ধারণা করা হয়, এর বড় অংশ গত বছরের মার্কিন হামলার পর ভূগর্ভস্থ স্থানে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
তবে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিস্তারিত কিছু থাকবে না। বরং এটি ভবিষ্যৎ আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হবে।
অবরুদ্ধ সম্পদ ফেরতের দাবি
অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ দ্রুত ফেরত চায়। ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘এই প্রক্রিয়ার একেবারে শুরুতেই অবরুদ্ধ সম্পদের মুক্তির বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।’
তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অবরুদ্ধ সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তি না দিলে এবং বাকিগুলো ফেরতের নিশ্চয়তা না থাকলে কোনো চুক্তি হবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হওয়ার পরই ইরানের সম্পদ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। বাঘাই জানিয়েছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনা হবে না। যদিও ইরানের দাবি অনুযায়ী, সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি চুক্তির খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
ফার্স নিউজ এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, শুধু তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই ৬০ দিনের মধ্যে ইরান প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হওয়ার পরই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয় বিবেচনা করা হবে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি
সংঘাত চলাকালে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্পও অভিযোগ করেছিলেন, ইরানের প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। যদিও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এটিকে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
লেবানন প্রসঙ্গ
ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত কীভাবে এই চুক্তির অংশ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকের ভাষায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের সমাপ্তি’র কথা উল্লেখ রয়েছে।
কিন্তু এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে ইসরায়েল যেন ‘সব ফ্রন্টে, লেবাননসহ, সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা’ বজায় রাখতে পারে—সে অবস্থানকে তিনি সমর্থন করেন।
শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে নেতানিয়াহুও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা
ইরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরান একটি ‘ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি’ করতে প্রস্তুত। তাদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা।
যদিও এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, তবুও উভয় পক্ষের চলমান আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সাম্প্রতিক সংঘাতের অবসানে একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে।