
উদ্যোক্তা তাহসিন শিউলি আক্তার
রাত নামলে যেমন বাংলার নদী ও প্রকৃতি এক মায়াবী রূপ নেয়, তেমনি নাগরিক কোলাহল আর আধুনিকতার ভিড়ে কিছু মানুষ চুপিসারে বুনে চলেন শেকড়ের গল্প। তাঁরা সুতোর টানে কিংবা ধাতুর ছোঁয়ায় বাঁচিয়ে রাখেন হাজার বছরের কৃষ্টি। তেমনই একজন স্বপ্নচারী মানুষ তাহসিন শিউলি আক্তার। আধুনিকতার তীব্র স্রোতে যখন হারিয়ে যাচ্ছিল বাংলার প্রাচীন কাঁসা-পিতল শিল্প, তখন তিনি সেই ধূলিমলিন ঐতিহ্যকে বুকে আগলে শুরু করেছিলেন এক নিঃশব্দ সংগ্রাম। আজ উদ্যোক্তা মহলে তিনি একাধারে একজন সফল নারী উদ্যোক্তা এবং সুপরিচিত ব্র্যান্ড ‘বি বাসিনী’র কর্ণধার।
তাহসিন শিউলি আক্তারের বেড়ে ওঠা এক সাধারণ অথচ মূল্যবোধসম্পন্ন পরিবারে, যেখানে সততা আর আত্মসম্মানের পাঠ ছিল প্রাত্যহিক। ছোটবেলা থেকেই বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, লোকশিল্প আর ঘরের কোণে রাখা পুরনো কাঁসার বাসন কিংবা পিতলের প্রদীপের আলো তাঁকে ভীষণভাবে টানতো।

সময়ের নিয়মে পড়াশোনা শেষ করে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন, কাটান প্রায় ৫টি বছর। এরপর সংসারের প্রয়োজনে দীর্ঘ ৮ বছরের এক নীরব বিরতি। কিন্তু যার রক্তে জড়িয়ে থাকে সৃষ্টির আনন্দ, তাকে কি আর চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা যায়? শিউলি বুঝতে পারলেন, কেবল চাকরি নয়, নিজের একটি স্বাধীন পরিচয় গড়ার মাঝেই রয়েছে জীবনের আসল তৃপ্তি। সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবের মায়া আর ভেতরের সুপ্ত জেদকে পুঁজি করে তিনি পা বাড়ালেন উদ্যোক্তা জীবনের রোমাঞ্চকর কঠিন পথে।
একটি নান্দনিক ও সংস্কৃতিমনস্ক নাম—‘বি বাসিনী’, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নারীর সৌন্দর্য আর বাংলার নিজস্ব আবহ। অত্যন্ত সীমিত পুঁজি নিয়ে অনলাইনে যাত্রা শুরু করেছিল শিউলি।। শুরুতে পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। ধাতব পণ্যের মান নিয়ে অনলাইনের ক্রেতাদের মনে ছিল এক আকাশ অবিশ্বাস। দক্ষ কারিগর খুঁজে পাওয়া, সাশ্রয়ী মূল্যে খাঁটি কাঁসা-পিতল সরবরাহ করা এবং ভাঙন ছাড়াই তা গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তবে শিউলি আক্তার দমে যাননি। পণ্যের বাস্তব ছবি, নিয়মিত লাইভ সেশন আর সততার চাদরে মুড়িয়ে তিনি জয় করতে শুরু করলেন মানুষের মন। লাভের চেয়ে ক্রেতার বিশ্বাস অর্জনকেই ব্যবসার বড় সম্পদ বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমানে ‘বি বাসিনী’তে শোভা পাচ্ছে—ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতলের থালা, বাটি, গ্লাস ও কাপ-পিরিচ, বনেদি ঘরানার পানের বাটা ও প্রাচীন চেরাগ, আধুনিক নান্দনিকতার হোম ডেকর আইটেম, ফুলের টব ও সাজি, শিশুদের জন্য বিশেষ ডিশ সেট এবং আকর্ষণীয় জুয়েলারি ও গিফট আইটেম।
আজ আর ‘বি বাসিনী’ কোনো একক সত্তা নয়, এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল কারিগরদের এক বিশাল কর্মসংস্থানের নাম। শিউলি আক্তার নিজের মেধাকে শাণিত করতে একে একে সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের SICIP প্রোগ্রাম, সিটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ কোর্সগুলো।

তার এই নিরলস কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আজ এসএমই ফাউন্ডেশন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জয়িতা ফাউন্ডেশন, অঙ্গনা, বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ এবং ফ্যাশন এন্টারপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (FEAB)-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একজন গর্বিত সদস্য।
বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রবাসীদের ডাইনিং টেবিলেও শোভা পাচ্ছে বি বাসিনীর পণ্য। বিয়ে, কর্পোরেট উপহার কিংবা নতুন গৃহসজ্জায় ‘বি বাসিনী’ এখন এক আস্থার নাম।
আগামী ৫ বছরে ‘বি বাসিনী’কে একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান শিউলি আক্তার, যেখানে বিশ্বমঞ্চে গর্বের সাথে লেখা থাকবে “Made in Bangladesh”। খুব শীঘ্রই নিজস্ব শোরুম ও কারখানা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

নতুনদের উদ্দেশ্যে শিউলি আক্তার বলেন, “রাতরাতি লাভের পেছনে না ছুটে আগে ব্র্যান্ড ও বিশ্বাস তৈরি করুন। ছোট থেকে শুরু করুন কিন্তু স্বপ্নটা দেখুন আকাশের মতো বড়।”
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ‘বি বাসিনী’ কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি শিউলি আক্তারের আত্মপরিচয়, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক জীবন্ত দলিল। শিউলি আক্তার বিশ্বাস করেন, যতদিন আমরা আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসবো, ততদিন বাংলার এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য কখনো হারিয়ে যাবে না।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প