
অতিভোজন এড়িয়ে সুস্থ থাকুন
ঈদুল আজহার মূল অনুষঙ্গই হলো কোরবানি এবং এরপর পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলে মাংসের বিভিন্ন পদের স্বাদ নেওয়া। গরু, খাসি, মহিষ কিংবা উটের মাংস—ঈদের দিনগুলোতে প্রায় সব ঘরেই রান্নার প্রধান আকর্ষণ থাকে এগুলো। অনেকেই মাংসের ক্ষতির কথা চিন্তা করে একেবারেই খেতে চান না, আবার কেউ কেউ কোনো রকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রচুর পরিমাণে মাংস খেয়ে ফেলেন।
চিকিৎসকদের মতে, দুটি অভ্যাসই ভুল। মাংস মূলত উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের একটি চমৎকার উৎস, যার শরীরে যথেষ্ট উপকারিতা রয়েছে। তবে মূল সমস্যাটি তৈরি হয় এর পরিমাণের কারণে। ঈদের খুশিতে অনেকেই একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণে তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত মাংস খেয়ে ফেলেন, যা পরিপাকতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে পেট ফাঁপা, বুক জ্বালাপোড়া, পেট ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, এসিডিটি এবং বারবার ঢেকুর ওঠার মতো অস্বস্তিকর সমস্যা দেখা দেয়। পর্যাপ্ত পানি পান না করার কারণে অনেকেই আবার তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শুরু থেকেই খাবারের একটি সঠিক পরিকল্পনা থাকা দরকার। যেহেতু বিকেল বা রাতে মাংস খাওয়ার ধুম পড়ে, তাই সকাল এবং দুপুরের খাবারটা হালকা রাখাই শ্রেয়। আত্মীয় বা বন্ধুর বাড়িতে গেলেও পরিমিত খাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। সুস্থ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের (যার ওজন ৬০ থেকে ৭০ কেজি) জন্য দৈনিক ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাম মাংস খাওয়া নিরাপদ বলে জানান বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিক কেয়ার ক্লিনিকের সিনিয়র নিউট্রিশনিস্ট ইসরাত জাহান ইফাত।
তবে এই পরিমাণ মাংস একবারে না খেয়ে তিন বেলা ভাগ করে খাওয়া উচিত। আর যদি একই দিনে ডিম, মুরগি বা অন্য কোনো প্রোটিন খাদ্যতালিকায় থাকে, তবে লাল মাংসের পরিমাণ ২০০ গ্রামের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। মাংস রান্নার ক্ষেত্রেও কিছু কৌশল অবলম্বন করলে তা স্বাস্থ্যের জন্য কম ক্ষতিকর হয়। রান্নার আগে লেবুর রস, টকদই, আদা, রসুন বা ভিনেগার দিয়ে মেরিনেট করে রাখলে মাংস দ্রুত সেদ্ধ ও সহজপাচ্য হয়। মাংসে অতিরিক্ত চর্বি আলাদাভাবে যোগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কম তেলে রান্না করার চেষ্টা করতে হবে। ডুবো তেলে ভাজা মাংসের চেয়ে বেক, গ্রিল, স্টিম করে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী।

এছাড়া মাংসের চর্বি ও প্রোটিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও সালাদ রাখা বাধ্যতামূলক। প্রতি ৫০ গ্রাম মাংসের বিপরীতে অন্তত ১০০ গ্রাম সবজি বা সালাদ খেলে তা হজম প্রক্রিয়াকে সাবলীল রাখে। ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমানোর অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে এবং অন্তত দুই ঘণ্টা পর বিছানায় যেতে হবে। খাওয়ার মাঝখানে বা পরপরই পানি পান করলে হজম রস পাতলা হয়ে যায়, যা হজমে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর পানি পান করা উচিত, তবে খাবারের মাঝে বোরহানি, টকদইয়ের ঘোল, জিরাপানি বা ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে, যা হজমে দারুণ সহায়তা করে।
কোক বা অন্যান্য কৃত্রিম রঙের কোমল পানীয় এ সময় সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলাই ভালো। বয়স এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার ওপর ভিত্তি করে ঈদের খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা জরুরি। তরুণ এবং যাদের কোনো শারীরিক জটিলতা নেই, তারা অতিরিক্ত চর্বি পরিহার করে যেকোনো মাংসই খেতে পারেন। তবে মধ্যবয়সী এবং প্রবীণদের ক্ষেত্রে কোনো রোগ না থাকলেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, উচ্চ মাত্রায় কোলেস্টেরল, স্ট্রোকের ঝুঁকি বা লিভারের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য দৈনিক ৬০ থেকে ৯০ গ্রামের বেশি লাল মাংস খাওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়।
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই এই রোগীদের সারাবছরের মতো ঈদের দিনও চর্বি ছাড়িয়ে পরিমিত মাংস খেতে হবে এবং মাংসের পাশাপাশি থাকা কলিজা, মগজ, ভুঁড়ি বা পায়ার মতো উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের মিষ্টি জাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে এবং কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের প্রোটিন কম খাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নামমাত্র মাংস খাওয়া উচিত।
যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, গরুর মাংসের কারণে তাদের চুলকানি বা ত্বকের সমস্যা বাড়তে পারে, তাই প্রয়োজনে আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সাথে রাখতে হবে। এছাড়া যাদের আইবিএস, পেপটিক আলসার বা পাইলসের সমস্যা আছে, মাংসের আধিক্যের কারণে তাদের পায়ুপথে জ্বালাপোড়া বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে। এই রোগীদের প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত, ফলের রস ও ইসবগুলের ভুষির মতো তরল খাবার বেশি খেতে হবে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টাসিড বা ওমিপ্রাজল জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হবে।
ঈদের এই উৎসবের দিনগুলোতে ঘরে আসা অতিরিক্ত ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলতে নিয়মিত হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়াম করা ভুলে গেলে চলবে না। এর পাশাপাশি কোরবানি পরবর্তী সময়ে মাংসের সঠিক সংরক্ষণও একটি বড় বিষয়। মাংস বিলিয়ে দেওয়ার পর অবশিষ্ট অংশ ফ্রিজে ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যাদের ফ্রিজের সুবিধা নেই, তারা নির্দিষ্ট সময় পর পর মাংস ভালোভাবে জ্বাল দিয়ে বা সিদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করে দীর্ঘদিন ধরে খেতে পারেন। তবে খাওয়ার আগে অবশ্যই মাংসের গুণগত মান ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।
ঈদ অবশ্যই আনন্দের এবং খাবারের তৃপ্তি ছাড়া এই আনন্দ অপূর্ণ। আত্মীয়-স্বজনের অনুরোধ বা নিজের মনের ইচ্ছায় হয়তো দু-একদিন একটু বেশি খাওয়া হয়েই যায়, তবে সুস্থ থেকে উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে পরিমিতি জ্ঞান ও সংযমের কোনো বিকল্প নেই।
ভিজুয়াল স্টোরি