
মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা রাস্তায় নামাজ পড়তে নিষেধ করছেন
ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার উপকণ্ঠে অবস্থিত ধুলাগড় গরুর হাটে নেই সেই চিরচেনা কোলাহল। হাটজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক গরু। বিক্রেতারা টিনের ছাউনি নিচে ছোট ছোট দলে বসে আছেন। কিন্তু ক্রেতার দেখা নেই বললেই চলে।
পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আসা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হিন্দু গরু ব্যবসায়ী বলেন, ঈদ উপলক্ষে গরুর ব্যবসা করতে তিনি উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছিলেন। গরু বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করার কথা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো ক্রেতা নেই।
‘এখন গরু কিনবে কে? মানুষ ভয় নিয়ে বেঁচে আছে।’ বলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ধুলাগড়ের এই হাটে হিন্দু বিক্রেতারা গরু আনতেন আর মুসলিম ক্রেতারা কোরবানির জন্য পশু কিনতেন। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি মুসলমান বাস করেন, যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে ঈদকে ঘিরে এই সময়টাতে সাধারণত জমজমাট ব্যবসা হতো।
সরকার পরিবর্তনের পর বদলে গেছে পরিস্থিতি
গত ৬ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকেই রাজ্যে গরু জবাই সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা শুরু হয়।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নির্দেশ দেন, সরকারি অনুমতি ছাড়া কোনো গরু জবাই করা যাবে না। এছাড়া নির্ধারিত কসাইখানা ছাড়া অন্য কোথাও পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়। আইন অনুযায়ী, জবাইয়ের জন্য পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে।
ভারতের অনেক রাজ্যে গরুকে পবিত্র প্রাণী হিসেবে দেখা হয় এবং গরু জবাই নিষিদ্ধ। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু বহন বা গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে বহু মুসলিম ও হিন্দু গরু ব্যবসায়ী হামলার শিকার হয়েছেন।
গরুর মাংসের ব্যবসায় ধস
সরকারি কড়াকড়ির পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে গরুর মাংসের ব্যবসায় বড় ধস নেমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কলকাতার জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট দ্য বার্গার শপ তাদের বিখ্যাত বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করেছে। সামাজিক মাধ্যমে তারা লিখেছে, ‘আমাদের বার্গারের কোনো ধর্ম নেই, কিন্তু রাজনীতির আছে।’
রেস্টুরেন্টটির সহ-মালিক উৎশা জানান, তাদের মাংস সরবরাহকারীকে পুলিশ ডেকে সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ রাখতে বলেছে। ফলে নতুন সরবরাহকারী না পাওয়ায় তাদের বিফ বার্গার বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
এদিকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের অনেকেই দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। বাজারে জীবিত গরুর দাম কেজিপ্রতি ৪০০ রুপি থেকে নেমে ১৫০ রুপিতে চলে এসেছে।
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মাংস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসিম বলেন, ‘আমরা ৬০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। আগে কখনও এমন পরিস্থিতি দেখিনি। এখন সরবরাহকারীরা ভয় পাচ্ছেন, ছোট খাবারের দোকানগুলোও আর মাংস কিনছে না।’
আরেক ব্যবসায়ী হায়দার আলী বলেন, ‘রেস্টুরেন্টগুলো ভয় থেকে এখন আর কাঁচা মাংস নিতে চায় না।’
কোরবানির পশু বিক্রি না হওয়ায় দুশ্চিন্তা
ধুলাগড় হাটের ‘সুন্দর’ নামের এক মুসলিম ব্যবসায়ী জানান—ঈদকে সামনে রেখে গরুর ব্যবসার জন্য তিনি মায়ের গয়না বন্ধক রেখে ১০ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় আমরা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ লাখ রুপি আয় করি। কিন্তু এবার ২৫টি গরুর একটিও বিক্রি হয়নি। আমি খুব ভয় পাচ্ছি।’
গত বছর তিনি প্রায় ১০০টি গরু বিক্রি করেছিলেন বলে জানান।
‘আইন শুধু এখন কঠোরভাবে মানা হচ্ছে’
বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘যে আইন আগে ঠিকভাবে মানা হতো না, এখন সেটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
তবে প্রাণী অধিকার বিষয়ক আইনজীবী জয়াসিমহা নুগ্গেহাল্লি মনে করেন, ভারতে গরু জবাইবিরোধী আইনকে প্রাণী সুরক্ষার বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এটি পরিচয়, ব্যবসা ও জীবিকার রাজনীতির সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
আর শুধু গরুর মাংসের ব্যবসাই নয়, ঈদের আগে মুসলিমদের মধ্যে আরও নানা ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা রাস্তায় নামাজ পড়তে নিষেধ করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক জায়গার মতো পশ্চিমবঙ্গেও মসজিদে জায়গা সংকটের কারণে ঈদ বা জুমার সময় রাস্তায় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
কলকাতার মাল্লিক বাজার ও পার্ক সার্কাস এলাকায় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার ঈদের কেনাকাটাও অনেক কম।
মানবাধিকারকর্মী ও লেখক হর্ষ মান্দার অভিযোগ করেন, বিজেপি একটি আদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘এখন নিজেদের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই যেন এক ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে।’
আল জাজিরা অবলম্বনে
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল