
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা যেন থামছেই না। একদিকে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, আর অন্য দিকে ইরানে নতুন করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। সোমবার (২৫ মে) ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি কৌশলগত নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে এই বিমান হামলা চালানো হয়। আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের এসব নৌকা সমুদ্রে মাইন পেতে রাখার চেষ্টা করছিল। ফলে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত নিজেদের সেনাদের নিরাপত্তার স্বার্থে এটিকে একটি ‘আত্মরক্ষামূলক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি ও হামলা প্রতিরোধেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হতাশাজনক বিষয় হলো, যখন কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষপর্যায়ের আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই এই হামলার ঘটনা ঘটল। কাতার প্রধানমন্ত্রীর মধ্যস্থতায় এই বৈঠকে অংশ নেন ইরানের শীর্ষ আলোচক ও খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে চায়। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে ‘অন্য ব্যবস্থা’ নেওয়ারও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্বের অন্যতম এই ব্যস্ত নৌপথটি যেন স্বাভাবিকভাবে খোলা থাকে, যুক্তরাষ্ট্র সেটিই চাইছে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বড় ধরনের আলোচনার কথা জানান তিনি।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’। তবে একই সঙ্গে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও হামলা হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘হয় ভালো চুক্তি হবে, না হলে কোনো চুক্তিই হবে না।’
জানা গেছে, দোহায় চলা এই রুদ্ধদ্বার আলোচনায় হরমুজ প্রণালি ছাড়াও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং বিভিন্ন দেশে জব্দ করে রাখা ইরানি অর্থ ছাড়ের বিষয় নিয়ে দরকষাকষি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েল বাঘাই বলেছেন, আগে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হতে হবে, এরপরই কেবল পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব।
অন্যদিকে ইরানও বসে থাকেনি, তারা পাল্টা দাবি করেছে যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শত্রুদের একটি ‘স্টেলথ ড্রোন’ ভূপাতিত করেছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমের দাবি, নতুন ধরনের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্যে ড্রোনটি গুলি করে নামানো হয়েছে। তবে ড্রোনটি সুনির্দিষ্টভাবে কোন দেশের ছিল, সে বিষয়ে তেহরান কিছু জানায়নি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা এখন ছড়িয়ে পড়েছে লেবানন সীমান্তেও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করা হবে। এরপরই লেবাননের বেকা উপত্যকাসহ কয়েকটি এলাকায় হিজবুল্লাহর স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। যদিও গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, তারপরও তেল আবিব বলছে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই তারা এই অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে, তবে তেহরান বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বলে দাবি করে আসছে। ওয়ানশিংটনের এই সরাসরি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের গভীর আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।