
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখেরও বেশি মুসল্লি ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত ‘হজ’ পালনের জন্য সৌদি আরবের মক্কায় সমবেত হয়েছেন। হজের পাঁচ দিনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে তাওয়াফ করেন।
বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু এই কাবা কালো রঙের বিশেষ কাপড় ‘কিসওয়া’ দিয়ে আবৃত থাকে। স্বর্ণসূতায় খচিত কোরআনের আয়াতে সজ্জিত এই আবরণ শুধু একটি কাপড় নয়, বরং ইসলামী ঐতিহ্য, শিল্প ও ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন।
নিচে কাবা ও কিসওয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি তথ্য তুলে ধরা হলো।
কাবা কী?
আরবি ভাষায় ‘কাবা’ শব্দের অর্থ ঘনক বা ঘনাকৃতির স্থাপনা। এটি ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান এবং মক্কার মসজিদুল হারামের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।
পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, মুসলমানরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কাবার দিকেই মুখ করে দাঁড়ান। এই দিককে বলা হয় কিবলা।
কাবার উচ্চতা প্রায় ১৩.১ মিটার (৪৩ ফুট), দৈর্ঘ্য ১২.৮ মিটার (৪২ ফুট) এবং প্রস্থ ১১.০৩ মিটার (৩৬ ফুট)।

কাবার ইতিহাস
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মহান আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কাবা নির্মাণ করেন। পবিত্র কোরআনে কাবার ভিত্তি নির্মাণের ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসলামের আগেও আরবের বিভিন্ন গোত্র কাবাকে উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহার করত এবং সেখানে অসংখ্য মূর্তি স্থাপন করেছিল।
খ্রিস্টীয় ৬৩০ সালের দিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবা থেকে সব মূর্তি অপসারণ করেন এবং এটিকে একত্ববাদী ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে প্রতিবছর ২ কোটিরও বেশি হজ ও ওমরাহ পালনকারী মুসল্লি মক্কা সফর করেন।

কাবার ভেতরে কী আছে?
কাবার উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সুবিশাল স্বর্ণের দরজা রয়েছে। প্রায় ২৮০ কেজি খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত এই দরজার উচ্চতা ৩.১ মিটার (১০ ফুট) এবং প্রস্থ ১.৯ মিটার (৬ ফুট)।
বছরে সাধারণত দুইবার বিশেষ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে কাবার অভ্যন্তর পরিষ্কার করা হয় এবং তখন দরজা খোলা হয়।
ভেতরের অংশ অত্যন্ত সরল ও সাদামাটা। সেখানে রয়েছে—
ছাদ ধারণকারী তিনটি কাঠের স্তম্ভ
ছাদে ওঠার একটি সিঁড়ি
মার্বেল পাথরে মোড়ানো দেয়াল ও মেঝে
ছাদ থেকে ঝুলন্ত কয়েকটি আলোকসজ্জা বা ঝাড়বাতি
কাবার অভ্যন্তরের কিছু দেয়াল বিশেষ কাপড় দিয়েও আবৃত থাকে।
কিসওয়া কী?
কাবাকে যে কালো রেশমি কাপড় দিয়ে আবৃত রাখা হয়, সেটিই কিসওয়া নামে পরিচিত। আরবি ‘ক-স-ওয়া’ মূল শব্দ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ ‘ঢেকে দেওয়া’ বা ‘আবৃত করা’।
হজ মৌসুমে লাখো মানুষের স্পর্শে ক্ষতি এড়াতে কিসওয়ার নিচের অংশ সাময়িকভাবে কিছুটা ওপরে তুলে রাখা হয়।
বর্তমান কিসওয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার (৪৫ ফুট)
৪৭টি পৃথক কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি
চারদিকে ৯৫ সেন্টিমিটার চওড়া ও প্রায় ৪৭ মিটার দীর্ঘ অলংকৃত বেল্ট (হিজাম)
কাবার দরজার ওপরে বিশেষ পর্দা, যাকে সিতারা বা বুরকু বলা হয়। এই অংশটিই কিসওয়ার সবচেয়ে অলংকৃত ও দৃষ্টিনন্দন অংশ।

কেন কাবা ঢেকে রাখা হয়?
ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, কাবাকে সম্মান জানানো, সংরক্ষণ করা এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে কিসওয়া দিয়ে আবৃত রাখা হয়। কাবাকে সর্বপ্রথম কে ঢেকেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য নেই। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আসআদ কামিল খ্রিস্টীয় প্রায় ৪০০ সালে প্রথম বিশেষ কাপড় দিয়ে কাবাকে আবৃত করেন।
আরেকটি মত অনুযায়ী, হজরত ইসমাইল (আ.) নিজেই প্রথম কাবা আবৃত করেছিলেন, যদিও এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কিসওয়া কী দিয়ে তৈরি?
বর্তমানে কিসওয়া প্রাকৃতিক রেশম (সিল্ক) দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে— লিনেন, তুলা, উল, চামড়া, পশুর চামড়াজাত উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে।
ইসলামী খেলাফত ও মুসলিম শাসকদের আমলে কিসওয়া বিভিন্ন স্থানে তৈরি হতো। একসময় মিসরের দামিয়েত্তা অঞ্চলের রাজকীয় কারখানাগুলোতে এটি বোনা হতো। পরে সিরিয়া, বাগদাদ, ইয়েমেন, মামলুক ও উসমানি সাম্রাজ্যের অধীনেও কিসওয়া প্রস্তুত করা হয়েছে।
বর্তমানে সৌদি আরবের মক্কার বিশেষ কিসওয়া কারখানায় এটি তৈরি হয়।

কিসওয়ার ওজন ও মূল্য কত?
বর্তমান কিসওয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয়— প্রায় ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম।১২০ কেজি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণসূতা। ১০০ থেকে ১২০ কেজি রুপার সূতা।
মক্কার কিসওয়া কারখানায় ২৪০ জনের বেশি দক্ষ কারিগর আধুনিক প্রযুক্তি, ঐতিহ্যবাহী তাঁত এবং আরবি ক্যালিগ্রাফির সমন্বয়ে এটি তৈরি করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কিসওয়া তৈরির ব্যয় বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ সৌদি রিয়াল (প্রায় ৬৬ লাখ মার্কিন ডলার) ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশি টাকায় যা ৮০ কোটির বেশি।
কিসওয়ায় কী লেখা থাকে?
কিসওয়ার গায়ে স্বর্ণ ও রৌপ্যসূতায় কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বাণী খোদাই করা থাকে। এর মধ্যে রয়েছে— কালিমায়ে শাহাদাত, হজ সম্পর্কিত আয়াত, কাবার মর্যাদা ও পবিত্রতা বিষয়ক আয়াত, আল্লাহর স্মরণ ও প্রশংসাসংবলিত বাণী।

কিসওয়া কি সবসময় কালো ছিল?
না। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিসওয়ার রং ছিল— সাদা, সবুজ, হলুদ, লাল, কালো। বিশেষত ইয়েমেনে তৈরি প্রাচীন কিসওয়াগুলো লাল-সবুজ ডোরাকাটা ছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে আব্বাসীয় খেলাফতের সময় থেকে কালো রং কিসওয়ার প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে তা স্থায়ী রূপ পায়।
কত বছর পরপর কিসওয়া পরিবর্তন করা হয়?
কিসওয়া প্রতি বছর একবার পরিবর্তন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কর্মীরা পুরোনো কিসওয়া খুলে নতুন কিসওয়া স্থাপন করেন। পরে পুরোনো কিসওয়ার মূল্যবান অংশগুলো—বিশেষ করে স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত আয়াত ও অলংকরণ—সংরক্ষণ করা হয়।
এসব অংশের কিছু জাদুঘরে পাঠানো হয়, কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন দেশের দূতাবাসকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। ছোট ছোট অংশ কখনো কখনো অতিথিদের মধ্যেও বিতরণ করা হয়।
এ কারণেই মাঝে মধ্যে কিসওয়ার কিছু টুকরো আন্তর্জাতিক সংগ্রহশালা কিংবা নিলাম বাজারেও দেখা যায়।

ইসলামী বিশ্বের এক অনন্য প্রতীক
কিসওয়া শুধু একটি কাপড় নয় এটি মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক ঐক্য, শিল্পকলা এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক। প্রতি বছর নতুন কিসওয়া কাবায় স্থাপন করার মধ্য দিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন এক ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে, যা হজযাত্রী ও মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ আবেগ ও শ্রদ্ধার স্থান দখল করে আছে।
আল জাজিরা অবলম্বনে