
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা ৮ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে চায় না। দুই দেশের মধ্যে এখনও মাঝেমধ্যে সামরিক উত্তেজনা ও সীমিত হামলা-পাল্টা হামলা চললেও পাকিস্তান, কাতার এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে চলমান আলোচনাগুলো থেমে যায়নি।
এখনও ইরানের ওপর আঘাত হানার মতো শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ধারণা করা হচ্ছে ইরানও তাদের সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রেখেছে এবং যুদ্ধবিরতির সময়টুকু ব্যবহার করছে নিজেদের পুনর্গঠন ও ক্ষয়ক্ষতি মেরামতের কাজে। পারস্য উপসাগর ও এর আশপাশের অঞ্চলে এই সশস্ত্র উত্তেজনা উভয় পক্ষের জন্যই ভুল হিসাব বা ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চায়। তাদের বার্তা স্পষ্ট—আমরা খুব কাছেই আছি এবং চাইলে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারি।
অন্যদিকে ইরানও জানিয়ে দিচ্ছে, প্রতিরোধের ব্যাপারে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত। প্রয়োজনে তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনার প্রথম লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ তৈরি করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন করাও সহজ হচ্ছে না।
এরই মধ্যে ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে যে তাদের বোমারু বিমান আবার লেবাননের বৈরুতে হামলা চালাবে। এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক বিকল্পগুলোকে আরও সীমিত করে দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্ভবত খুব একটা উদ্বিগ্ন নন যে লেবাননে নতুন সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কারণ শুরু থেকেই তিনি তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির বিরোধিতা করে আসছেন। তার দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো সমঝোতাই খারাপ চুক্তি।
অন্যদিকে ইরান এখনও লেবাননের শক্তিশালী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তেহরান স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বিস্তৃত চুক্তি করতে হলে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও বন্ধ হতে হবে। এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলকে সংযত রাখার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি: বৈশ্বিক অর্থনীতির গলায় ফাঁস
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরান মূল্য দাবি করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সেই মূল্য হতে পারে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা অথবা জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া।
গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি খোলা না হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো অর্থবহ আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। একসময় অত্যন্ত ব্যস্ত এই জলপথ দিয়ে এখন খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে। সৌদি আরব তাদের কিছু তেল লোহিত সাগর উপকূলের বন্দরগুলোতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠাচ্ছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতও হরমুজ প্রণালির বাইরে, ওমান উপসাগরমুখী উপকূলে অবস্থিত টার্মিনালগুলোতে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করছে।
তবে এসব বিকল্প ব্যবস্থা বিশ্ববাজারের ক্ষতি পূরণ করতে পারছে না।
বিশ্ব এখন তার স্বাভাবিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হারিয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখন আর উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর আগের মতো নির্ভরশীল নয়, তবুও দেশটির জ্বালানি মূল্য বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ট্রাম্পের কঠিন রাজনৈতিক সংকট
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক জটিল অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তিনি এমন একটি যুদ্ধের ফল ভোগ করছেন, যা শুরু করার সময় তিনি মনে করেছিলেন দ্রুত এবং সহজ বিজয় অর্জন করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু উভয়েই ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতিরোধক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, ব্যাপক বিমান হামলাই তেহরানের সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেবে। কিন্তু তা ঘটেনি। এখন ট্রাম্পের সামনে সহজ কোনো পথ খোলা নেই।
একদিকে তাকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে হবে। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মার্কিন জনগণের মধ্যে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যুদ্ধ আবার বড় আকারে শুরু হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়বে।
সমস্যা হলো, ইরান যে ধরনের ছাড় দাবি করছে, তার অনেকগুলোই ট্রাম্পের নিজ দলের কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া ট্রাম্প নিজেও এমন কোনো চুক্তি করতে চান না, যা দেখে মনে হতে পারে তিনি ২০১৫ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা ইরান পারমাণবিক চুক্তির মতো কোনো সমঝোতায় ফিরেছেন। কারণ প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তিনি নিজেই সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছিলেন।
টিকে থাকার লড়াই হিসেবে যুদ্ধকে দেখছে ইরান
ইরানের শাসকগোষ্ঠী বিশ্বাস করে তারা মূলত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে। তাদের মতে, এই সংঘাত শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক নয়; এটি শাসনব্যবস্থার বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বা ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে আরও হামলা চালালেও তেহরানের অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা খুব কম। ট্রাম্প ও তার মন্ত্রিসভার শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন একদিকে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে চাইছেন, অন্যদিকে দ্রুত যুদ্ধের ইতি টানারও চেষ্টা করছেন, যাতে রাজনৈতিক ক্ষতি সীমিত রাখা যায়।
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগ
এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী আরব দেশগুলোও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল নির্ভর করে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর। যুদ্ধ সেই ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলের ‘স্থিতিশীল ব্যবসায়িক কেন্দ্র’ হিসেবে যে ভাবমূর্তি ছিল, তা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কাতার বর্তমানে পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করেছে। এমনকি ইসরায়েল সেখানে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তা পরিচালনার জন্য সেনা মোতায়েন করেছে।
এদিকে সৌদি আরব দাবি করেছে, তারা ইরানের কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যা ছিল ইরানের আগের হামলার জবাব। তবে সৌদি সূত্রগুলো বলছে, তারা তেহরানকে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে এই পদক্ষেপ তারা স্বাধীনভাবে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের অংশ হিসেবে নয়।
ভুল হিসাবের মূল্য
যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তখন দুজনই বিশ্বাস করতেন যে তাদের শক্তিশালী বিমান বাহিনী ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
তারা এমন একটি শাসনব্যবস্থার চরিত্র বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং নানা সংকট মোকাবিলা করে টিকে আছে।
এখন সেই ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই নয়, পুরো বিশ্বকেই বহন করতে হচ্ছে।
জেরেমি বোয়েন: বিবিসি’র আন্তর্জাতিক সম্পাদক।