
এল নিনো আবার ফিরে আসতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের আগেই এল নিনো গঠনের সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর একবার শুরু হলে নভেম্বর পর্যন্ত এটি স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানায়, সম্ভাব্য এই এল নিনো অন্তত মাঝারি মাত্রার হতে পারে, তবে এটি আরও শক্তিশালী রূপও নিতে পারে। কিছু জলবায়ু বিজ্ঞানী ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন, এটি চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী ইতোমধ্যেই উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে নতুন এল নিনো দেখা দিলে তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হতে পারে।
কোথায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে।
এল নিনোর সময় সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক এলাকায় খরা বা শুষ্ক আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
এছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়লেও আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড়ের সংখ্যা তুলনামূলক কম হতে পারে।
আবার কি রেকর্ড গরমের বছর আসছে?
সবশেষ এল নিনো দেখা গিয়েছিল ২০২৩-২৪ সালে। সেটি ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী পাঁচটি এল নিনোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং ২০২৪ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর অন্যতম কারণ ছিল।
জলবায়ুবিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, দশক শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবী নতুন করে সবচেয়ে উষ্ণ বছরের রেকর্ড দেখতে পারে। এল নিনো ফিরে এলে সেই রেকর্ড ২০২৭ সালেই হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন এল নিনো বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ইতোমধ্যেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যদি দীর্ঘ খরা, অতিবৃষ্টি বা তীব্র তাপপ্রবাহ যুক্ত হয়, তাহলে কৃষকদের ক্ষতি আরও বাড়বে এবং খাদ্য সরবরাহও বিঘ্নিত হতে পারে।
জলবায়ু বিশ্লেষক গ্যারেথ রেডমন্ড-কিংয়ের মতে, ২০২৭ সালে যদি আবারও রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা যায়, তাহলে বিশ্বের বহু কৃষক বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন এবং অনেক অঞ্চলে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
কী এই এল নিনো?
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি কয়েক বছর পরপর দেখা যায় এবং প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়।
এ সময় সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
ডব্লিউএমও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়েছে। সমুদ্রের গভীর স্তরেও অতিরিক্ত উষ্ণতার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা এল নিনো গঠনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
কী করতে হবে?
জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেস বলেছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান