
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় পরাজয়ের ধাক্কা সামলানোর আগেই নতুন সংকটে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। দলের একটি বড় অংশের বিদ্রোহ, বিধানসভায় ভাঙন এবং কলকাতার মেয়রের পদত্যাগে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে টিএমসির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বুধবার বিধানসভার স্পিকার ৫৮ জন বিদ্রোহী টিএমসি বিধায়ককে পৃথক ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর দলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে থাকা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, দলের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পদত্যাগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ দাবি করেন, হাকিমের পদত্যাগের আবেদন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রহণ করেছেন।
তবে কলকাতা পৌর করপোরেশনের চেয়ারম্যান মালা রায় জানিয়েছেন, মেয়রের পদত্যাগপত্র এখনো তার কাছে জমা পড়েনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই গেছে।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি প্রশাসনিক বৈঠকে ফিরহাদ হাকিমের অংশগ্রহণ তৃণমূলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। যদিও হাকিমের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, তিনি মেয়র ও বিধায়ক হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়কে আলাদা করেই দেখেছেন।
দলের সংকট আরও গভীর হয়েছে বিধাননগর পৌর করপোরেশনের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ ১৬ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করা এই নেতা জানিয়েছেন, এটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই টিএমসির বিধায়ক দলে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বর্তমানে ৫৮ জন বিধায়ক তাদের সঙ্গে রয়েছেন এবং আরও কয়েকজন শিগগিরই সিদ্ধান্ত জানাবেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এখনও আমাদের প্রধান নেতা হিসেবে সম্মান করি। তবে দল পরিচালনায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের আপত্তি রয়েছে।’
একই সঙ্গে তিনি দলটির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, তাদের এই আন্দোলন ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে।
এদিকে চলমান সংকট মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গজুড়ে দলের সব সাংগঠনিক কমিটি ভেঙে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের ওপর ব্যাপক পর্যালোচনা চালানো হবে। পর্যালোচনা শেষে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
তবে স্পিকারের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। তার দাবি, দল থেকে বহিষ্কৃত কোনো বিধায়ক কখনোই বিরোধী দলনেতা হতে পারেন না এবং তৃণমূল এখনও রাজ্যের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে রয়েছে।
নির্বাচনী পরাজয়ের পর একদিকে বিধানসভায় ভাঙন, অন্যদিকে পৌর প্রশাসনে পদত্যাগের হিড়িক—সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এখন দলটি কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে উঠে নিজেদের পুনর্গঠন করে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল