
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এখন জনশক্তি রপ্তানির যে পতন দেখা যাচ্ছে তা মূলত শুরু মাত্র; পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে আরও বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্য সচিব আলী হায়দার চৌধুরী জানান, বর্তমানে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের ভিসা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নতুন চাহিদা কমে যাওয়ার প্রকৃত প্রভাব সামনে আরও স্পষ্ট হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া কার্যত বড় কোনো শ্রমবাজার আমাদের জন্য উন্মুক্ত নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগ সীমিত এবং সেখানে ভারতীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কাতার ও কুয়েতে অল্পসংখ্যক কর্মী যাচ্ছে এবং মালয়েশিয়ার বাজার এখনও বন্ধ রয়েছে। ইউরোপের কিছু দেশে সুযোগ তৈরি হলেও কনস্যুলার জটিলতার কারণে তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, হজের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং সামনে বৈশ্বিক ইভেন্টকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো ও সেবাখাতে নতুন চাহিদা তৈরি হতে পারে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান সংকুচিত হলেও দেশে রেমিট্যান্স আসার গতি বেশ চাঙ্গা রয়েছে। সাধারণত যুদ্ধের সময় প্রবাসীদের মধ্যে জমানো টাকা দ্রুত দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। পাশাপাশি বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও নজরদারি বৃদ্ধির ফলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ১ হাজার ৩০ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। এর মধ্যে মার্চে এসেছে ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার ডলার, এপ্রিলে ৩১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার এবং মে মাসে ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
তুলনামূলকভাবে, গত বছরের একই তিন মাসে দেশে এসেছিল ৯০১ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স। ফলে এক বছরের ব্যবধানে মার্চ-মে সময়ে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১২৯ কোটি ১০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে দ্রুত শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ করা জরুরি। মালয়েশিয়ার বাজার দ্রুত চালু করার পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বাজারে টেকসই সাফল্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ভাষা শিক্ষা এবং কূটনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব রেমিট্যান্স আয়ের ওপরও পড়তে পারে।