
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম বলেছেন, এই আলোচনাগুলো ছিল অর্থহীন এবং লেবাননের জন্য অপমানজনক। তিনি দাবি করেন, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীও এই চুক্তি মেনে নেয়নি।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েল ও লেবানন একটি নতুন যুদ্ধবিরতি কাঠামোয় সম্মত হয়েছে। এর আওতায় লেবাননের ভেতরে কিছু ‘পাইলট নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলা হবে, যেখানে হিজবুল্লাহর কোনো সদস্য বা কার্যক্রম থাকবে না।
তবে বৃহস্পতিবার হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেম বলেন, এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির অর্থ হচ্ছে হিজবুল্লাহকে একতরফাভাবে অস্ত্রবিরতি মানতে হবে এবং দক্ষিণ সীমান্ত থেকে সরে যেতে হবে, যা কার্যত আত্মসমর্পণের শামিল। তার মতে, এতে ইসরায়েলের লক্ষ্যই পূরণ হবে।
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল, যা হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানকার বাসিন্দারাও চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
চুক্তিতে কী আছে?
ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চার দফা আলোচনার পর এই সমঝোতা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকার মধ্যে থাকা সব হিজবুল্লাহ যোদ্ধাকে সরিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে ওই অঞ্চলের কিছু অংশ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় শুধুমাত্র লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। সেখানে কোনো অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকবে না।
তবে এসব নিরাপত্তা অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট অবস্থান বা বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেছেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, আপাতত ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সামরিক অভিযান ও হামলা চালিয়ে যাবে, যাতে তারা ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস করতে পারে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিল জানিয়েছে, বুধবার রাতে মর্টার হামলায় আহত হওয়া তাদের এক শান্তিরক্ষী মারা গেছেন।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, হিজবুল্লাহর ছোড়া মর্টার ইউনিফিলের অবস্থানে আঘাত করেছিল। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি হিজবুল্লাহ।
যুদ্ধের পটভূমি
গত ২ মার্চ ইরানপন্থী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা চালানোর পর সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে বিমান হামলা এবং দক্ষিণাঞ্চলে স্থল অভিযান শুরু করে।
১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদারের নির্দেশ দেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে অন্তত ৩,৫২৬ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কতজন যোদ্ধা ও কতজন বেসামরিক নাগরিক, তা আলাদা করে জানানো হয়নি।
জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাতের কারণে লেবাননে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সীমান্তের দুই পাশে সংঘর্ষে ২৬ জন ইসরায়েলি সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।