
এটাই নামের রাজনীতি। এটাই ঔপনিবেশিক ভাষার ক্ষমতা — সে শুধু শাসন করে না, সে নাম বদলে দেয়, উচ্চারণ বদলে দেয়, এবং এতটাই নিখুঁতভাবে বদলে দেয় যে বদলটা টেরও পাওয়া যায় না।
একটা জায়গার নাম কীভাবে বদলে যায়, সেটা নিয়ে আমরা খুব কমই ভাবি। বগুড়ার কাছে একটা ছোট্ট রেলশহর — সান্তাহার। নামটা শুনলে চেনা লাগে, কিন্তু এর পেছনে যে গল্পটা লুকিয়ে আছে, সেটা অনেকেই জানেন না। একটা নাম কীভাবে একটু একটু করে বদলে গেল, কীভাবে একটা অনুনাসিক স্বর হারিয়ে গেল ইতিহাসের ভাঁজে — সেটাই আজকের গল্প।
শুরুটা করতে হবে আরও পেছন থেকে। এই জায়গার আসল পরিচয় ছিল ‘সুলতানপুর’ নামে। তখন এটি রাজশাহী জেলার অন্তর্গত। ব্রিটিশ আমলে ১৮২১ সালে আদমদীঘি থানা রাজশাহী থেকে আলাদা হয়ে নবগঠিত বগুড়া জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু সুলতানপুর নামটা তখনো টিকে ছিল। পরিচয় বদলাতে সময় লাগে।
এরপর এলো রেললাইন। ব্রিটিশ সরকার যখন উত্তরবঙ্গ ও আসামের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ তৈরি করতে চাইল, তখন এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব হঠাৎ বেড়ে গেল। ১৯১০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে শাকোল-সান্তাহার বিভাগকে ব্রডগেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালু হলো। এই রেললাইন ঘিরে গড়ে উঠতে থাকল একটা নতুন জনপদ। আর সেই জনপদের পরিচয় হলো রেলস্টেশনের নাম দিয়ে।
সেই নামটাই হলো আসল রহস্যের জায়গা।
রেলস্টেশনের কাছে যে এলাকাটা ছিল, স্থানীয় মানুষ তাকে ডাকত ‘সাঁতাহার’ বলে। ‘সাঁ’ — এই অনুনাসিক উচ্চারণটা বাংলার নিজস্ব সম্পদ। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন যখন ম্যাপে, কাগজে, রেলের বোর্ডে নাম লিখল, তখন রোমান হরফে লিখল — Santahar। ইংরেজি বর্ণমালায় বাংলার চন্দ্রবিন্দু ধরার কোনো উপায় নেই। ফলে ‘সাঁ’ হয়ে গেল ‘সান্’।
এটা শুধু সান্তাহারের গল্প নয়। ব্রিটিশ আমলে এভাবে অসংখ্য বাংলা নাম রোমান হরফে লেখার সময় তাদের উচ্চারণ হারিয়ে ফেলেছে। চাঁদপুর লেখা হয়েছে Chandpur, রাঁচি হয়েছে Ranchi, বাঁশখালী হয়েছে Banshkhali। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে একটা করে ‘সাঁ’ বা ‘চাঁ’ বা ‘রাঁ’ হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে কারণ সেটা লেখা যায়নি, আর যা লেখা যায় না, তা ধীরে ধীরে মুখ থেকেও হারিয়ে যায়।

Santahar থেকে বাংলায় যখন আবার ফিরে আসার সময় হলো, তখন মানুষ পড়তে শুরু করল ‘সান্তাহার’। এটাই স্বাভাবিক। যে প্রজন্ম ‘সাঁতাহার’ নামটা জানত, তারা ততদিনে সংখ্যায় কমে আসছিল। নতুন প্রজন্ম বোর্ডে যা দেখেছে, তাই পড়ছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে গেল। সুলতানপুর নামটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলো। সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো সান্তাহার।
তখন থেকে এই নামেই চেনা এই শহর। বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলইয়ার্ড এখানে। প্রতিদিন কত ট্রেন আসে-যায়, কত মানুষ নামে-ওঠে। কিন্তু কেউ জানে না যে এই স্টেশনের নামের ভেতরে একটা হারানো শব্দ আছে। একটা চন্দ্রবিন্দু আছে, যেটা কোনো এক সময় মানুষের মুখে ছিল, কিন্তু ব্রিটিশের কলমে হারিয়ে গেছে।
ভাষার এই ক্ষতটা দেখা যায় না। মানচিত্রে ‘সান্তাহার’ লেখা থাকে, উচ্চারণও ‘সান্তাহার’ হয়। কিন্তু যদি কোনো পুরনো মানুষকে জিজ্ঞেস করেন, যদি লোকমুখের স্মৃতিতে কান দেন — তাহলে শুনতে পাবেন কোথাও একটা ‘সাঁতাহার’ বাতাসে এখনো ভেসে আছে। টিকে আছে অল্প অল্প করে, যেভাবে পুরনো কথা টেকে; লিখিত ইতিহাসে নয়, মানুষের মুখে।
এটাই নামের রাজনীতি। এটাই ঔপনিবেশিক ভাষার ক্ষমতা — সে শুধু শাসন করে না, সে নাম বদলে দেয়, উচ্চারণ বদলে দেয়, এবং এতটাই নিখুঁতভাবে বদলে দেয় যে বদলটা টেরও পাওয়া যায় না। সান্তাহারে ট্রেন থামে, যাত্রীরা নামেন, আবার উঠে যান। প্রায় কেউই জানেন না যে, এই এলাকার আসল নামে একটা চন্দ্রবিন্দু ছিল।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প