
আদালতে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ। আজ রোববার (৭ জুন) সকাল ৯টার দিকে মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কঠোর নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আজ এই ঐতিহাসিক মামলার রায় ঘোষণা করবেন। তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কসহ মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় দেশজুড়ে এখন সবার দৃষ্টি ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের দিকে।
মামলার বিবরণ ও এজাহার থেকে জানা যায়, পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পল্লবীর নিজ বাসার ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে ডেকে নেয়। পরবর্তীতে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তার মা। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং ভেতরের একটি বালতি থেকে তার কাটা মাথা উদ্ধার করা হয়।
দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় তোলা এই ঘটনায় ২০ মে ভিকটিমের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলা দায়ের করেন।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দিনই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে। ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় দ্রুত তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে শিশুটির বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞসহ ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
গত ৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হলে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। এরপর ৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু দাবি করেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে।
রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ প্রধান আসামি সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন এবং স্বপ্না আক্তারের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান।
আজকের এই কাঙ্ক্ষিত রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দুই আসামির চূড়ান্ত আইনগত পরিণতি। রায়ের আগের দিন এক গোলটেবিল বৈঠকে নিহত শিশুটির বাবা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের হত্যার বিচার চান না—বরং এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা চান যেখানে আর কোনো শিশুকে এমন নির্মমতার শিকার হতে না হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হওয়া এই মামলার রায় শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বিচারিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর বার্তা দেবে।