
রামিসা আক্তার
আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় এক অনন্য রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ। দেশের সামগ্রিক বিচারিক প্রেক্ষাপটে এর আগে এত দ্রুত কোনো মামলার রায় আসার নজির নেই। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় আজ রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (খাতুন) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আদালত সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।
রাজধানীর পল্লবীতে সংঘটিত এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। জড়িতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজধানীতে তীব্র প্রতিবাদ ও নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। জনগণের সেই ক্ষোভ এবং দ্রুত বিচার পাওয়ার আকাক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এই রায়ে। এই ঐতিহাসিক রায়কে দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি বড় মাইলফলক এবং নতুন যাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আগামীতে এই ধরনের যেকোনো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা দেবে এবং অপরাধীদের মনে ভয়ের সৃষ্টি করবে।
উল্লেখ্য, নিহত রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজেদের কক্ষে নিয়ে যান। পরে সেখানে রামিসাকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক উপায়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। মেয়ের খোঁজ না পেয়ে একপর্যায়ে আসামিদের ঘরের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান তার মা। ডাকাডাকিতে সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে রামিসার শিরশ্ছেদ করা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে স্বপ্নাকে আটক করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। ঘটনার পরদিন, অর্থাৎ ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের সমন্বিত তৎপরতায় এই মামলার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে রেকর্ড গতিতে। হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষে মাত্র ৫ দিনের মাথায় (২৪ মে) আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশ। এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পর ২ জুন মামলার বিচারিক কাজ পুরোদমে শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালে মোট ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে রামিসার পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ করা হয়।
আদালতে সোহেল রানা শিশু রামিসাকে হত্যার আগে ধর্ষণ এবং নিজের অপরাধের দায় স্বীকার করে। অন্যদিকে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন তাকে পালাতে সহযোগিতা করায় দুজনেই সমান অপরাধে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
খুব অল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের দ্রুততম বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের এই ঘটনা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সচেতন মহল মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি শক্ত বার্তা পৌঁছাবে, যা আগামীতে শিশুদের ওপর এমন নারকীয় নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।