
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
ইরান এই যুদ্ধকে ‘অযৌক্তিক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চল ও লেবানন পর্যন্ত। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা পুরোপুরি থামেনি।
যুদ্ধের শুরুতে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ সংযম ও কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক দেশকে আরও সক্রিয় করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি সংঘাতের প্রভাবের মুখে পড়ে। ইরান মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে বিভিন্ন হামলা চালালে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব তা কঠোর ভাষায় নিন্দা জানায়।
কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একদিকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললেও অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ওমান, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে, যুদ্ধকে ‘ভয়াবহ ভুল সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করেছে। দেশটি শুরু থেকেই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের অবস্থান
তুরস্ক যুদ্ধ শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে সব পক্ষকে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বারবার আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা বলেছেন।
ইরাক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানালেও নিজ ভূখণ্ডকে যুদ্ধের বাইরে রাখতে চেষ্টা করছে। তবে দেশটিতে ইরানপন্থী গোষ্ঠী ও মার্কিন বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
মিসরও শুরু থেকেই যুদ্ধ বন্ধ এবং দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া
ভারত যুদ্ধ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লি কোনো পক্ষের সরাসরি সমর্থন না দিয়ে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি হামলার সমালোচনা করেছে ভারত।
অন্যদিকে পাকিস্তান শুরু থেকেই হামলার বিরোধিতা করে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করে ইসলামাবাদ।
বাংলাদেশ যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব দেশটিকেও ভোগাতে শুরু করেছে।
চীন ও রাশিয়ার সমর্থন ইরানের পাশে
চীন শুরু থেকেই সামরিক অভিযান বন্ধ এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়ে আসছে। বেইজিং বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা অবশ্যই সম্মান করতে হবে।
রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানকে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে উল্লেখ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া ভেটোও দিয়েছে।
ইউরোপের সতর্ক অবস্থান
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য একদিকে ইরানের আঞ্চলিক হামলার নিন্দা করেছে, অন্যদিকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে।
তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পুনরারম্ভ এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
জাপান ও আসিয়ানের উদ্বেগ অর্থনীতি নিয়ে
জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে, যা এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির কার্যত অচলাবস্থা পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের দ্বিধা
কানাডা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানালেও যুদ্ধ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ব্রাজিল হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
মেক্সিকোও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং সরাসরি কোনো পক্ষ নেয়নি।
জাতিসংঘের সতর্কবার্তা
জাতিসংঘ মহাসচিব বারবার সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং এটি পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তার মতে, কেবল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
কেন বদলেছে বিভিন্ন দেশের অবস্থান?
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর সময় অনেক দেশ ধারণা করেছিল এটি হয়তো স্বল্পমেয়াদি সংঘাত হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়েছে, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বেড়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।
ফলে শুরুতে নীরব বা সতর্ক থাকা অনেক দেশ এখন প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতি, সংলাপ এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকারও নিজ নিজ জনগণের চাপের মুখে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে আরও জোরালো অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বাংলা টেলিগ্রাফ পর্যবেক্ষণ