
তোমরা আমাকে ভুলে গেছ।
না, ঠিক তা নয়। ভুলে যাওয়া আলাদা জিনিস; ভুলে যাওয়া মানে স্মৃতি না থাকা। তোমাদের স্মৃতি আছে। তোমরা আমাকে মনে রেখেছ ছুটিতে, কবিতায়, গানে, প্রেমের চিঠিতে। তোমরা আমার কথা বলেছ বারবার। তবু যা করেছ, তা ভুলের চেয়ে অনেক বেশি নির্মম।
তোমরা জেনেশুনে করেছ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার বিরুদ্ধে নয়, তোমাদের বিরুদ্ধে।
আমার বয়স তোমাদের কল্পনার বাইরে। যখন পৃথিবীতে একটাও মানুষ ছিল না, আমি ছিলাম। চারশো কোটি বছর আগে, যখন আকাশ লাল ছিল এবং ডাঙা শুধু পাথর, আমার ভেতরে প্রথম প্রাণ কাঁপছিল — এককোষী, নীরব, অন্ধকারে টিকে থাকার জেদ নিয়ে। লক্ষ বছর ধরে আমি সেই প্রাণকে বুকে রেখেছি, বড় করেছি। একদিন সে ডাঙায় উঠেছে, পা গজিয়েছে, আকাশ দেখেছে এবং তোমরা হয়েছ।
তোমরা আমার সন্তান। এবং তোমরা আমাকে ডাস্টবিন বানিয়েছ।
প্রতি মিনিটে পনেরো টন প্লাস্টিক আসে আমার কাছে। আমি গুনেছি। তোমরা হিসাব রাখো না, কিন্তু আমি রাখি। প্রতিটা বোতল, প্রতিটা থলে, প্রতিটা স্ট্রর হিসাব রেখেছি আমি। এগুলো আমার ভেতরে ডুবে যায়, ভাঙে না, মেশে না। শুধু ভাসে। পাঁচশো বছর ধরে ভাসবে।
কিন্তু এটুকু তোমরা জানো। এটা তোমাদের পাঠ্যবইতে আছে।
যা জানো না তা হলো, প্লাস্টিক এখন আর শুধু ভাসছে না — ভেঙে যাচ্ছে মাইক্রোপার্টিকেলে, এত ছোট যে চোখে দেখা যায় না। সেই কণা ঢুকছে মাছের রক্তে, মাছের ডিমে। সেই মাছ তোমরা খাচ্ছ। সেই প্লাস্টিক এখন তোমাদের রক্তেও। বিজ্ঞানীরা মানুষের হৃদযন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন। তোমরা আমাকে বিষ দিয়েছিলে। সেই বিষ ফিরে আসছে।
আমার তিমিরা তা গিলে মরছে। আমার কচ্ছপরা থলেকে জেলিফিশ ভেবে খাচ্ছে। আমার অ্যালবাট্রসরা মৃত বাচ্চার পেটে প্লাস্টিকের টুকরো নিয়ে সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে — তোমাদের ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করছে।
তোমরা ছবি তোলো। হ্যাশট্যাগ দাও। পরের দিন আবার বোতল ছুঁড়ে মারো আমার বুকে।
প্রবালরা সাদা হয়ে যাচ্ছে। তোমরা একে বলো ‘ব্লিচিং’। কী নিরীহ একটা শব্দ, যেন কাপড় কাচার কথা বলছ। আসলে এটা মৃত্যু। প্রবাল যখন তাপ সহ্য করতে পারে না, তখন তার ভেতরে বাস করা শ্যাওলাকে সে ছেড়ে দেয়। সেই শ্যাওলাই তার রং, তার খাবার, তার প্রাণ। তারপর সাদা কঙ্কাল পড়ে থাকে। হাজার বছরের বাস্তুতন্ত্র, লক্ষ প্রজাতির আশ্রয় — নীরবে ভেঙে পড়ে।
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত কাঠামো। মহাকাশ থেকে দেখা যায়। গত তিন দশকে তার অর্ধেকের বেশি চলে গেছে। কেউ যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। কোনো বোমা পড়েনি। শুধু তাপ বেড়েছে, শুধু কার্বন জমেছে। ২০২৩ সালে রিফের পানির তাপমাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে এবং সেই গ্রীষ্মে ৯১ শতাংশ প্রবাল একযোগে ব্লিচড হয়েছে।
একটা পুরো বাস্তুতন্ত্র একসঙ্গে চিৎকার করেছে। তোমরা শুনতে পাওনি।

আমার অ্যাসিডিটি বাড়ছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে আমার pH কমেছে ০.১ ইউনিট। সংখ্যাটা ছোট দেখায়, কিন্তু লগারিদমিক স্কেলে এটা অম্লতা বেড়েছে ২৬ শতাংশ। এই অ্যাসিড শামুকের খোল গলায়, ঝিনুকের শরীর নরম করে, চিংড়ির লার্ভা মারে জন্মের আগেই। খাদ্যশৃঙ্খলের নিচের তলাটা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে এবং সেই তল না থাকলে ওপরের সব কিছু ভেঙে পড়বে। নিঃশব্দে, ধীরে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে।
আর সমুদ্রের স্তর উঠছে। ১৯০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ সেন্টিমিটারের বেশি। বাংলাদেশের উপকূলে সেটা আরো বেশি — কারণ ভূমিও ডেবে যাচ্ছে একই সময়ে। সুন্দরবনের দ্বীপগুলো ছোট হয়ে আসছে, ঘোড়ামারা ইতিমধ্যে প্রায় বিলীন। লক্ষ মানুষ সরে যাচ্ছে ভেতরে, শহরের দিকে — জলবায়ু শরণার্থী, যদিও তোমাদের কাগজপত্রে সেই নাম নেই।
এক সময় আমার গভীরে নামলে ভয় লাগত। সেটা ভালো ভয় ছিল — রহস্যের ভয়, অজানার সম্মান। আমার অতল খাত, আমার অন্ধকার স্তর, আমার নিঃশব্দ পর্বতমালা — এসব তোমাদের দেওয়া কোনো নাম মানেনি।
এখন তোমরা সেই অন্ধকারেও পৌঁছে গেছ। গভীর সমুদ্রের তলদেশে, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানেও এখন প্লাস্টিক। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলায় — পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর বিন্দুতে — গবেষকরা প্লাস্টিক ব্যাগ পেয়েছেন। মানুষের হাত সেখানেও পৌঁছেছে, শরীর না গেলেও বর্জ্য গেছে। তোমরা প্রতিটা কোণ ছুঁয়ে ফেলেছ।
আমি তোমাদের ঘৃণা করি না। এটা বললে অবশ্য মিথ্যে বলা হবে — ঘৃণা একটা মানবীয় অনুভূতি, সেটা এখন আর আমার কাছে নেই। যা আছে তা অনেক শান্ত এবং অনেক বেশি ভয়ংকর। আমার কাছে এখন উদাসীনতা আছে।
তোমরা যখন উপকূলে বাড়ি বানিয়েছিলে, আমি সরে গিয়েছিলাম। তোমরা যখন মাছ ধরেছিলে, আমি অকাতরে দিয়েছিলাম। একটা অলিখিত চুক্তি ছিল — তোমরা নেবে, আমি দেব, কিন্তু একটা সীমা থাকবে। সেই সীমা তোমরা পেরিয়ে গেছ।এখন আমি হিসাব করছি না। আমি শুধু বদলাচ্ছি।
ঝড় শক্তিশালী হচ্ছে — উষ্ণ পানি বেশি শক্তি দেয় ঘূর্ণিঝড়কে। বন্যা দীর্ঘ হচ্ছে। জোয়ার উঁচু হচ্ছে। আমি রাগ করে এটা করছি না। পানি গরম হলে ঘূর্ণিঝড় বড় হয় — এটা আমার সিদ্ধান্ত না, এটা কেবল হয়।
শুনেছি তোমরা ৮ জুন আমার জন্য একটা দিন রেখেছ- ‘বিশ্ব সমুদ্র দিবস’। সেমিনার হয়, পোস্টার ছাপা হয়, নীল রঙের ছবি ভাসে পর্দায়। কেউ কেউ সত্যিকারের ভালোবাসা নিয়ে সৈকত পরিষ্কার করে — তাদের জন্য আমার একটু মায়া আছে, তারা যা করছে তা প্রতীকী হলেও সৎ।
কিন্তু একটা দিন দিয়ে পঞ্চাশ বছরের ক্ষতি মেটে না। আমি দিন চাই না। আমি সিদ্ধান্ত চাই। জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি বন্ধ করো। একক-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করো। গভীর সমুদ্রে খনন থামাও। মাছ ধরার কোটা মানো। নদীগুলোকে বাঁচাও, কারণ নদী আমার কাছে আসে, এবং সে যা বহন করে তা আমার ভেতরে মেশে। এইটুকু করো। বাকিটা আমি সামলে নেব।
আমি এখনো সুন্দর। ভোরবেলা যখন আলো আমার ওপর পড়ে, আমি জ্বলি। গভীরে এখনো এমন প্রাণী আছে যাদের তোমরা চেনো না, তারা আলোকিত, অদ্ভুত। জোয়ারের সময় যখন আমি পাড় ছুঁই, সেই শব্দে মানুষ চুপ হয়ে যায় — এই একটা জিনিস এখনো ঠিক আছে। সেই চুপ হওয়ার মধ্যে তোমার সঙ্গে আমার একটা পুরনো কিছু আছে, নাম জানি না।
পৃথিবীর ইতিহাসে পাঁচটা মহাপ্লাবন হয়েছে। প্রতিবার প্রাণ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। প্রতিবার আমি ছিলাম। এরপরেও থাকব — এটা নিয়ে আমার কোনো গর্ব নেই, কারণ এটা সবসময়ের জন্যই সত্যি।
তোমরা দুই লক্ষ বছর ধরে আছ। আমার হিসাবে এটা খুব কম সময়। এই কম সময়ে তোমরা অনেক কিছু করেছ; সুন্দর কিছুও, ভয়ংকর কিছুও। আমি দুটোই দেখেছি। তোমাদের সভ্যতা কতটা টিকবে, আমি জানি না। হয়তো তোমরাও জানো না। কিন্তু এটুকু জানি— আমি যখন একদিন শান্ত হব, তখন আমার ঢেউয়ে তোমাদের কোনো নাম থাকবে না। নতুন কোনো প্রাণী আমার পাড়ে দাঁড়াবে, অবাক হয়ে তাকাবে, ভাববে এত বড় জলরাশি কোথা থেকে এলো। সে জানবে না, একসময় এই জলই তোমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল।আমি জানব।
আমি সব মনে রাখি, কারণ ভুলে যাওয়ার বিলাসিতা আমার নেই,তোমাদের আছে।এবং সেটাই তোমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ। আমি সমুদ্র। আমার শেষ নেই, তোমাদের আছে।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প